যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনের বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মোমেন তালুকদার খোকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ ধরনের মামলায় অভিযুক্ত কোনো আসামির এর আগে খালাসের নজির না থাকায় মোমেনের ক্ষেত্রে ভালো কিছু আশা করছে না দলীয় হাইকমান্ড। সে জন্য আগামী নির্বাচনে এ আসনে নতুন মুখ খুঁজে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, হাইকমান্ডের এমন মনোভাবের কথা জেনে এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী স্থানীয় বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা তৎপর হয়ে উঠেছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আব্দুল মোমেনের পরিবারের সদস্য এবং জেলা বিএনপির একাধিক নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে তারা দলে তাদের অনুগতদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নিজেদের আকাঙ্ক্ষার কথা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে তুলে ধরা এবং তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য আসছে রমজানে ইফতার মাহ্ফিল কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামারও পরিকল্পনা করছেন। তাদের কয়েকজন নির্বাচনে নতুন মুখ।
আব্দুল মোমেন ১৯৭১ সালে রাজাকার কমান্ডার ছিলেন। তার বাবা তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা ও পরে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য প্রয়াত আব্দুল মজিদ তালুকদারও পিস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। আদমদীঘি ও সান্তাহারের ৪ মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ১৮ মে বিএনপি নেতা আব্দুল মোমেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন।
বগুড়া-৩ আসনে ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১০টি নির্বাচনের মধ্যে ৫টিতে জয়ী হন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে আসনটি নৌকা মার্কার প্রার্থী পেলেও ১৯৭৯ সালে তা ধানের শীষের দখলে চলে যায়। বিএনপির টিকিটে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাবেক মুসলিম লীগ নেতা আব্দুল মজিদ তালুকদার। ১৯৯১ সালেও তিনি দ্বিতীয় দফা এমপি নির্বাচিত হন। তার মৃত্যুর পর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনে অবসরপ্রাপ্ত এক সামরিক কর্মকর্তার হাতে ধানের শীষ তুলে দেওয়া হয়। একই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পান আব্দুল মোমেন।
সূত্র জানায়, প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদে কিংবা দলীয় রাজনীতিতে তেমন সাফল্য দেখাতে না পারায় ২০০১ সালের নির্বাচনে মোমেনের মনোনয়ন অনিশ্চিত হয় পড়েছিল। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিনি সে সময় সৌদি আরবে বসবাসরত জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তার এক ভাইকে কাজে লাগিয়ে বিএনপির
হাইকমান্ডে তদবির করে আবারও ধানের শীষের মনোনয়ন পান। পরে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে নিজ এলাকার জামায়াত নেতাদের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি তৃতীয় দফা মনোয়ন পান। সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক হন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় তার অনুপস্থিতিতে এবার এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন- জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ফজলুল বারী তালুকদার বেলাল, সান্তাহার পৌরসভার মেয়র তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টু, সান্তাহার পৌর বিএনপির সভাপতি কামরুল ইসলাম, আব্দুল মোমেনের ভাই আদমদীঘি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও দলের সভাপতি আব্দুল মুহিত তালুকদার, বগুড়া শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হামিদুল হক চৌধুরী হিরু ও দুপচাঁচিয়া পৌরসভার মেয়র বেলাল হোসেন।
আঞ্চলিকতার প্রভাব : জেলার দুই উপজেলা আদমদীঘি এবং দুপচাঁচিয়া নিয়ে বগুড়া-৩ আসন হলেও ১৯৯১-পরবর্তী সব নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন ছিল আদমদীঘি থেকে। আসছে নির্বাচনে এলাকার কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য কেন্দ্রে চাপ সৃষ্টি করবেন দুপচাঁচিয়া উপজেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা। জানতে চাইলে দুপচাঁচিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হামিদ বলেন, ১৯৯১ সালের পর থেকে কোনো নির্বাচনেই দুপচাঁচিয়ার কোনো নেতা সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন পাননি। জিয়ানগর ইউনিয়ন বিএনপির কর্মী আজিজার রহমান বলেন, 'মামলার কারণে সাবেক এমপি খোকা এবার নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে আমরা দুপচাঁচিয়ার কোনো নেতার মনোনয়ন চাইব।'
মনোনয়নপ্রত্যাশী ফজলুল বারী তালুকদার বেলাল বলেন, 'আমি এর আগে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। আগামীতেও চাইব। আশা করি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।' অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী বগুড়া শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হামিদুল হক চৌধুরী হিরু বলেন, 'নেতাকর্মীরা আমাকে প্রস্তুতি নিতে বলছেন। আমি এর আগে উপজেলা নির্বাচন করেছি। আগামীতে দলের কাছে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন চাইব।'

মন্তব্য করুন