আট বছরের মধ্যে এডিপি বাস্তবায়ন সর্বনিম্ন

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৭      

সমকাল প্রতিবেদক

২০১৬-১৭ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে সরকার যে ব্যয় করতে চেয়েছিল তার ৮৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো। যা গত আট অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। সর্বশেষ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৯০ শতাংশের কম ছিল। তার পরের ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে সবসময় এডিপির সংশোধিত বরাদ্দের ৯০ ভাগের বেশি বাস্তবায়ন হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদায়ী অর্থবছরে এডিপির মূল বরাদ্দ ও সংশোধিত বরাদ্দ সমান ছিল; কিন্তু আগের অর্থবছরগুলোতে সংশোধিত বরাদ্দ মূল বরাদ্দের তুলনায় কম ছিল। যে কারণে বছর শেষে বরাদ্দের তুলনায় বাস্তবায়ন হার বেশি হয়েছে; কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মূল বরাদ্দ ও সংশোধিত বরাদ্দ সমান থাকায় বাস্তবায়ন হার কম হয়েছে। এ ছাড়া আগাম বৃষ্টি, অর্থবছরের শুরুতে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার কারণে এডিপি বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পেঁৗছাতে পারেনি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য মতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নসহ মূল এডিপিতে মোট বরাদ্দ ছিল এক লাখ ১৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতেও এই বরাদ্দ রাখে সরকার। এক হাজার ৬৬৮টি প্রকল্পে এসব অর্থ খরচ করার কথা। এর মধ্যে সরকারের ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও তাদের অধীনস্থ সংস্থাগুলো এক লাখ ৬ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বা ৮৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির ৯২ দশমিক ৭২ শতাংশ বা ৮৭ হাজার ৬৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল মন্ত্রণালয়গুলো। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭১ হাজার ১৩৭ কোটি বা ৯১ শতাংশ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫৬ হাজার ৯১৩ কোটি বা বরাদ্দের ৯৫ শতাংশ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫০ হাজার ৩৫ কোটি বা ৯৬ শতাংশ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ২০ কোটি বা বরাদ্দের ৯৩ শতাংশ, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩৩ হাজার ৭ কোটি বা ৯২ শতাংশ ও ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৯১৭ কোটি বা বরাদ্দের ৯১ শতাংশ ব্যয় করেছিল মন্ত্রণালয়গুলো।
সূত্র মতে, সর্বশেষ জুন মাসেই এডিপির মোট ব্যয়ের ২৫ শতাংশ বা ২৯ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে মন্ত্রণালয়গুলো। এর আগে ১১ মাসে মন্ত্রণালয়গুলো ৭৭ হাজার ২০৪ কোটি টাকা বা ৬৪ দশমিক ৭২ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়নে ব্যয় করেছে। গত মে মাসে ব্যয় হয়েছিল ১২ হাজার ১২২ কোটি টাকা। এক মাসের এই বিশাল ব্যয় নিয়ে নানান প্রশ্ন আছে।
এডিপির পুরোটাই বাস্তবায়ন হবে এমন আশাবাদী ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, গুলশানে জঙ্গি হামলার কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা অনেকে দেশ ছেড়ে গেছেন। যে কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ফিরে এসেছেন। আশা করা যায়, অর্থবছর শেষে এডিপির পুরোটাই বাস্তবায়ন হবে।
আইএমইডি সচিব মফিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, প্রধানত আগাম বৃষ্টির কারণে বাস্তবায়ন কিছুটা কম হয়েছে। তবে ব্যয় যা কম দেখা যাচ্ছে, তা শতাংশের হিসাবে। টাকার অঙ্কে এডিপির ব্যয় আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। ফলে এডিপি বাস্তবায়ন কম হয়েছে এ কথা বলা ঠিক হবে না।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, অন্যান্য বছর মূল এডিপি ও সংশোধিত এডিপির মধ্যে পার্থক্য থাকে। সর্বশেষ অর্থবছরে তা ছিল না। যে কারণে বাস্তবায়নের হারে কম হয়েছে। এ
ছাড়া এডিপি বাস্তবায়নের প্রশাসনিক দুর্বলতা তো রয়েছেই। সেটাও বাস্তবায়ন কম হওয়ার অন্যতম কারণ।
আইএমইডির তথ্যমতে, এ বছর এডিপির ব্যয়ে আগের তুলনায় ভিন্নতা ছিল। আগে কোনো মন্ত্রণালয় তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যয় করতে না পারলে যে মন্ত্রণালয় বেশি ব্যয় করতে পেরেছে তারা ওই মন্ত্রণালয়ের অব্যয়িত অর্থ নিতে পারত। গত অর্থবছর থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় এ সুযোগ বন্ধ রেখেছে। ফলে মোট ব্যয় কম হয়েছে।
গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এর পরই রয়েছে নৌ পরিবহন ও বিদ্যুৎ বিভাগ। এ তিন মন্ত্রণালয় লক্ষ্যের চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে। এ ছাড়া গৃহায়ন, গণপূর্ত, প্রতিরক্ষা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়েছে শীর্ষ দশ ব্যয়কারী মন্ত্রণালয়ের তালিকায়। এদিকে সবচেয়ে কম ব্যয়ের ১০ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে রয়েছে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, সেতু বিভাগ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং আইন ও বিচার বিভাগ।