সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে সংসদে ােভ প্রকাশ করেছেন সাংসদরা। রোববার সংসদের বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা একযোগে সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন। বিচার বিভাগ রিভিউর (রায় পুনর্বিবেচনা) মাধ্যমে এই সংশোধনী পুনর্বহাল করবেন বলে তারা আকাগ্ধা ব্যক্ত করেন।
বর্তমান সংসদ ষোড়শ সংশোধনী পাস করে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণের মতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনেন। এরূপ মতা ১৯৭২ সালের সংবিধানে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা রাষ্ট্রপতির হাতে ও পরে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রয়োগের বিধান করা হয়। রিট আবেদনের পরিপ্রেেিত হাইকোর্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেন। সরকার এর বিরুদ্ধে আপিল করলে অপিল বিভাগ অ্যামিকাস কিউরিদের অভিমত শ্রবণসহ শুনানি শেষে গত ৩ জুলাই হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন অর্থাৎ বিচারকদের অপসারণের মতা হারায় সংসদ। বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রের আইনসভা বা সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে টানাপড়েন চলছে।
গতকালের আলোচনায় সাংসদদের প থেকে হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলা হয়, সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা দাবি করেন, এই সংশোধনী কোনোভাবেই সংবিধানের মূল কাঠামোকে আঘাত করেনি। তাই এই রায় অনভিপ্রেত।
এই রায়ের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরাচারের প্রবর্তিত সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে আনা হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলে একাধিক মন্ত্রী ও সাংসদ বলেন, আদালতের শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরিরা অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, এই রায়ের মাধ্যমে সংসদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তপে করা হয়েছে।
বাজেট অধিবেশনে টানা ৯ দিনের বিরতির পর গতকাল রোববার বিকেল ৫টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। মাগরিবের বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে অনির্ধারিত এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটান জাসদের সদস্য মইনউদ্দীন খান বাদল।
আলোচনার শুরুতে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশন ক েউপস্থিত না থাকলেও পরে আসেন।
আপিল শুনানিতে আদালত যে সিনিয়র ১২ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছিলেন তাদের ১০ জন মতামত উপস্থাপন করেন। তাদের মধ্যে টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, এম আমীর-উল ইসলাম, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ফিদা এম কামাল, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, এ এফ হাসান আরিফ, এ জে মোহাম্মদ আলী এবং এম আই ফারুকী ষোড়শ সংশোধনীর বিপ েএবং কেবল আজমালুল হোসেন কিউসি সংশোধনীর প েমত দিয়েছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ :গতকাল সংসদে আলোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদকে আমরা পুনঃস্থাপন করেছিলাম। আদালতের রায় নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমার বক্তব্য সংসদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে। আদালতের শুনানিতে অংশ নিয়ে অ্যামিকাস কিউরিরা অসত্য কথা বলেছেন। ভুল তথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, বাহাত্তরে ভারতকে অনুসরণ করে আমরা সংসদের হাতে বিচারকদের অপসারণ মতা দিয়েছিলাম। এখন ভারতে এটা নেই। তার মতো লোক এ ধরনের অসত্য কথা বলছেন।
তোফায়েল বলেন, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বলেছেন, এ ব্যবস্থা কোথাও নেই। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ পদ্ধতি সংসদের হাতে রয়েছে। তিনি সাউথ আফ্রিকা, নেপাল ও শ্রীলংকার সংবিধানের কথা উল্লেখ করে বলেন, একমাত্র ব্যতিক্রম পাকিস্তান। সেখানে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল আইউব খান চালু করেছেন। জিয়াউর রহমান আইউব খানকে অনুসরণ করে এ পদ্ধতি আমদানি করেন।
এই দুই অ্যামিকাস কিউরিকে সুবিধাবাদী আখ্যায়িত করে তোফায়েল বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও তারা ভুল বক্তব্য দিয়েছেন।
মতিয়া চৌধুরী :প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, কয়েক মাস আগে প্রধান বিচারপতির আদেশে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার দুর্নীতি দমন কমিশনে আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত না করার জন্য হাস্যকর কারণের ওপর নির্ভর করে বলেছিলেন, বিচারপতির দায়িত্ব পালনকালে অনেক কষ্ট করে মৃত্যুদণ্ডসহ অনেক রায় দিয়েছেন। তদন্ত যদি তার বিরুদ্ধে করা হয়, সে বিচারের বিষয়ও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
মতিয়া চৌধুরী বলেন, প্রধান বিচারপতির নিজস্ব সিদ্ধান্ত হলেও সুপ্রিম কোর্টের নাম শুধু নয়, সুপ্রিম কোর্টের প্যাড ব্যবহার করা হয়েছে।
রাশেদ খান মেনন :বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু আদালত এই সংশোধনী বাতিল করে বললেন, এটা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোথায় সাংঘর্ষিক সেটা বলেননি।
ড. কামাল হোসেন রঙ বদলিয়েছেন বলে সমালোচনা করে তিনি বলেন, তিনি ১/১১-এর সময় সেনা কর্তৃপরে সঙ্গে আঁতাত করে মাইনাস টু থিওরির সপ েমত দিয়েছিলেন।
মেনন বলেন, সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা চলছে। এটা বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ কি-না তা ভেবে দেখতে হবে।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু :আলোচনায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, সংসদ যদি সংবিধানের বাইরে যায় সেটা দেখার দায়িত্ব বিচার বিভাগের রয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আমরা একমত। আবার বিভাগের দায়বদ্ধতা কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সেটা নিয়েও আলোচনা করতে চাই। বিচারকরা যখন রায় দেন সেটা ভুলও হতে পারে, অজ্ঞতাপ্রসূতও হতে পারে। তার জন্য আমরা কোনো ব্যবস্থা নেব না। শুধু ব্যক্তিগত অসদাচরণ করলেই তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপে েসংসদ রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠাবে।
শেখ ফজলুল করিম সেলিম :আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ৯৬ ধারা সংবিধানের মূল ভিত্তির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা কি আপনাদের উত্তরসূরিদের মতো অশুভ শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতে চান? সেই ইচ্ছা আর পূরণ হবে না। বাংলাদেশে সেই সুযোগ আর আসবে না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার সংসদের কাছে জবাবদিহি করেন, অথচ বিচারকদের করা যাবে না। তাহলে কি তারা জবাবদিহিতার ঊধর্ে্ব? ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংসদের সঙ্গে বিচার বিভাগের সংঘর্ষ বাধিয়ে তারা ফল পেতে চায়।
বিচার বিভাগকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, সংসদের হাতে দায়িত্ব থাকবে। রায় নিয়ে আপনারা বসে থাকেন। সংসদ বিচার বিভাগের ন্যায্য বিচার করবে। বহু বিচারপতি আইছে-গেছে।
মইনউদ্দীন খান বাদল :জাসদের মইনউদ্দীন খান বাদল বলেন, সারাজীবন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে নির্যাতিত হয়েছি। কিন্তু সাম্প্রতিককালের কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে যা অনভিপ্রেত। ৯৬ ধারা সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারকে কোথায় ধাক্কা দিয়েছে, সেটা বিচার বিভাগকে পরিষ্কার জবাব দিতে হবে। সংবিধানের রক সেটা ঠিক- মানছি, কিন্তু যে কোনো আইন বাতিল করতে তারা পারেন না। যেটা সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারের পরিপন্থী সেটাই বাতিল করার মতা তাদের রয়েছে। এই রায়ের জনগণের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, তা ইতিহাসের কাছে ছেড়ে দিলাম।
এ ছাড়া আরও আলোচনায় অংশ নেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার অধ্যাপক আলী আশরাফ, স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী ও বিএনএফের আবুল কালাম আজাদ।
জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু :জাতীয় পার্টির সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, এই সংসদ রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে পারলে বিচারকদের কেন পারবে না? তিনি বলেন, এই আদালত পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছিলেন। পঞ্চম সংশোধনীতেই সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সংসদ নতুন কিছু করেনি। আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ুণ্ন করতে চাই না। এই সংসদ সার্বভৌম। জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, রিভিউয়ের মাধ্যমে ৯৬ ধারা বহাল রেখে বিচার বিভাগ সংসদের প্রতি সম্মান দেখাবে। জনগণের প্রতি সম্মান দেখাবে।
স্পিকার :আলোচনার শেষ পর্যায়ে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, 'ষোড়শ সংশোধনী বিষয়ক যে রায় সুপ্রিম কোর্ট গত ৩ জুলাই ঘোষণা করেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয় সম্পর্কিত। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ- নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা বা জাতীয় সংসদ ও বিচার বিভাগ। এই তিনটি অঙ্গ নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন সংবিধান অনুসারে। এ তিনটি অঙ্গের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে আইনের শাসন নিশ্চিত হয়, মানবাধিকার সমুন্নত থাকে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত হয় ও সুশাসন নিশ্চিত হয়, যা গণতন্ত্রকে সুসংহত করে। পয়েন্ট অব অর্ডারে উত্থাপিত আলোচনায় সাংবিধানিক বিষয় সম্পর্কিত হওয়ায় সংসদে এই বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। এ বিষয়ে পরবর্তী সময় নির্ধারিত দিনে জাতীয় সংসদে আলোচনার সুযোগ থাকবে।'

মন্তব্য করুন