সেমিনারে বক্তারা

পাহাড়ধস থামাতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০১৭      

সমকাল প্রতিবেদক

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট এ দুই কারণে পাহাড়ধস হচ্ছে। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধসের পেছনে মানবসৃষ্ট কারণই দায়ী। যুগ যুগ ধরে পাহাড় কেটে সেখানে সমতল ভূমির অধিবাসীদের বসতি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বনভূমি ধ্বংস করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে নানা অবকাঠামো। পাহাড়ের ভেতর ও ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করার আগে ভূতাত্তি্বক জরিপ করা হয়নি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা এই সুযোগ নিয়ে পাহাড় ধ্বংস করেছে। ফলে একের পর এক ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। এতে শুধু জানমালের ক্ষতি হয় না, পাহাড়ের মাটির কারণে আশপাশের জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে কমে যাচ্ছে ব্যবহারযোগ্য ভূমি। পাহাড়ধস থামাতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পাশাপাশি ধস মোকাবেলায় দেশের সব পাহাড় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণগুলো চিহ্নিত করে মানচিত্র প্রণয়ন করতে হবে। এসব দেখভালের জন্য সব সংস্থার সমন্বয়ে একটি সেল গঠন করা প্রয়োজন। এতে ক্ষয়ক্ষতি কম হবে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে 'ভূমিধস :কারণ, ফলাফল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা' শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশে চীনে দূতাবাস, বাংলাদেশ চীনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) ও বাংলাদেশ-চায়না কালচারাল অ্যান্ড ইকোনমিক সেন্টার (বিসিসিইসি) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে বক্তারা দেশের পার্বত্য এলাকার পাহাড় ও বনভূমি ধ্বংস বন্ধে কঠোর উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পুরো এলাকাটি সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করার পরামর্শ দেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, পাহাড়ধস থামাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। দেশের উন্নয়ন করতে গিয়ে প্রকৃতিকে কতটুকু ধ্বংস করব, আর প্রকৃতিকে কতটুকু রক্ষা করব, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি বলেন, সমতলের মানুষদের পাহাড়ে নিয়ে বসতি করানো হয়েছে। পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকে কোণঠাসা করতে এসব করা হয়েছে। আগে পাহাড়ের মালিকানা ছিল না। এখন পাহাড়ে জমি কেনাবেচার খবর পাওয়া যায়।
সভাপতির বক্তব্যে গবেষক ও কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগকে শুধু প্রকৃতির কা হিসেবে দেখলে হবে না। এর পেছনে দুর্বৃত্ত ও নষ্ট রাজনীতি জড়িত। ধস প্রতিরোধে সরকারের একটি বিশেষ সেল গঠনের পরামর্শ দেন তিনি। দেশের সব পাহাড়কে সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করে সংরক্ষণ করারও পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, এত বড় একটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটার পরও সরকারের তরফ থেকে এখনও তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে মনে হচ্ছে, সামনের বছর বা এর পরের বছর আরও বড় বড় পাহাড়ধসের ঘটনা দেখতে হবে।
মূল বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, সংরক্ষিত রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে কাপ্তাই এলাকায় প্রথম ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এরপর এ পর্যন্ত পাহাড়ধসে ৪৪৮ জন মারা গেছেন। তিনি বলেন, এই দুর্যোগে এত মানুষ মারা গেলেও দেশের দুর্যোগ আইনে পাহাড়ধস নামে কোনো শব্দ নেই।

ফায়ার ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান বলেন, পাহাড় কেটে বাড়ি বানানো হচ্ছে। গভীর নলকূপ বসানো হচ্ছে। এসবই পাহাড়ধসের জন্য দায়ী। পূর্বাভাস পাওয়ার আগে ও পরে স্থানীয় প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পাহাড়ে বসবাসকারীদের সতর্ক করলেও অনেকে সরেনি। তার মতে, বিপদের মাত্রা অনুযায়ী পাহাড়ের মানচিত্র প্রণয়নের পাশাপাশি পাহাড়ে বাড়িঘর নির্মাণে বিল্ডিং কোড করা উচিত।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক ড. মাহবুবা নাসরিন, কিউ এম মাহবুব, বাপার সাধারণ সম্পাদক এম এ মতিন প্রমুখ।