প্রবেশের অপেক্ষায় আরও দুই লক্ষাধিক

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭

মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া (কক্সবাজার) থেকে

মিয়ানমারের বুচিডংয়ের রাখাইন পল্লীর জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে লাগানো হয়েছে লাল রঙের সাইন বোর্ড। তাতে লেখা রয়েছে- এটি বৌদ্ধদের আদি বাসস্থান। এখানে বাঙালিদের বসবাসের কোনো অধিকার নেই। মাইকিং করে বলা হচ্ছে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে মংডু, বুচিডং, রাশিডং এলাকার রাখাইন রাজ্য ত্যাগ না করলে তাদের করুণ পরিণতি হবে। বর্মী সেনা ও সশস্ত্র রাখাইন যুবকরা একেকটি গ্রাম ঘিরে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, যাতে তারা স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। সচ্ছল পরিবারে হানা দিয়ে টাকা, স্বর্ণালঙ্কার লুট করছে। বাধা দিলে মা-বাবার সামনে বাড়ির মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ ভয়ানক পরিস্থিতি থেকে প্রাণে বাঁচতে সহায়-সল্ফপদ ফেলে এক কাপড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছি। এভাবেই নিজের প্রতিক্রিয়া জানালেন বুচিডংয়ের মরিচ্ছং গ্রামের চেয়ারম্যান
মাস্টার নবী হোসেন। তার মতে, এমন আরও দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ঝোপ-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
গত শুক্রবার গর্জনদিয়া সীমান্ত দিয়ে নাফ নদ পার হয়ে বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান রোহিঙ্গা নেতা নবী হোসেন। তিনি জানান, তার সঙ্গে রয়েছেন বয়োবৃদ্ধ বাবা অছিয়র রহমান (৭৫), মা সায়েরা বিবিসহ (৬৫) পরিবারের ১৭ সদস্য। তাদের গরু-মহিষের খামার, মাছের প্রকল্প, ২০০ কানি জমির ধান, টাকা, স্বর্ণালঙ্কার এমনকি মূল্যবান সামগ্রী লুট করেছে রাখাইন যুবকরা। তার পূর্বপরিচিত কয়েকজন বিজিপি সদস্য আশ্বস্ত করেছিল, তাদরে কেউ মারবে না তবে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। মরিচ্ছং গ্রামের এ চেয়ারম্যান জানান, তারা চলে আসার খবর পেয়ে তাদের গ্রামসহ আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রামের প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ সপরিবারে বুচিডং ত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী বৃহস্পতিবারের আগে তারাও এপারে চলে আসতে পারে বলে আশঙ্কা তার।
গত শুক্রবার ভোরে কুইয়ানচি বং, বাইলাখালী, সোজাপাড়া দিয়ে আসা ১০ হাজার রোহিঙ্গা এখন বালুখালী ও কুতুপালং ক্যাম্পের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইনের সোজাপাড়া থেকে আসা রফিক উল্লাহ (২৫) জানান, সেখানার একটি মাদ্রাসায় তিনি শিক্ষকতা করতেন। মিয়ানমার জান্তারা সে মাদ্রাসায় মর্টার শেল নিক্ষেপ করে ধ্বংস করে দিয়েছে। খোঁজ করছে মাদ্রাসা শিক্ষকদের। এ অবস্থায় সহায়-সম্পদ ফেলে জীবন বাঁচাতে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে তিন দিন পাহাড়ি পথে হেঁটে ও নদী পেরিয়ে এখানে এসেছেন।
বুচিডংয়ের গর্জনদিয়া গ্রাম থেকে আসা আনু মিয়া (২২) জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিজিপির সোর্স হিসেবে তাদের কাজকর্ম করে আসছিলেন। তাকে দিয়ে গ্রামে গ্রামে সাইন বোর্ড পুঁতে গ্রামবাসীদের বলেছে তাড়াতাড়ি গ্রাম ত্যাগ করতে, নইলে মেরে ফেলা হবে। এ দৃশ্য দেখে তিনি স্ত্রী-পরিজন নিয়ে রাতারাতি গ্রাম ছেড়ে গর্জনদিয়ার গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নেন। পরে তাকে না পেয়ে তারা বাড়িটি পুড়িয়ে দেয় সেনারা।
আইওএমের প্রকল্প কর্মকর্তা সৈকত বিশ্বাস বলেন, মিয়ানমারে সেনা অভিযানের কারণে জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। রোহিঙ্গা নেতা ডাক্তার জাফর আলম জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদ পার হয়ে বালুখালী ও কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। তারাও বলছে, আরও দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এ দেশে আসার জন্য পথে রয়েছে।
পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, গত কয়েকদিনে পালংখালী সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ২৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে।