আজ জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি দিবস

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭

কামরুল ইসলাম


আজ জগন্নাথ হল ট্রাজেডি দিবস। দল বেঁধে সাপ্তাহিক ধারাবাহিক নাটক 'শুকতারা' দেখার সময় ৩১ বছর আগে ১৯৮৫ সালের আজকের এই দিনে ধসেপড়া ছাদের নিচে চাপা পড়ে মারা গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ৩৮ জন ছাত্র-কর্মচারী-অতিথি। উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়ে মারা যান আরও দু'জন। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
জগন্নাথ হলের যেখানে বর্তমানে অক্টোবর স্ট্মৃতিভবন সেখানেই ঘটেছিল এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এই নির্মম ট্র্যাজেডির স্ট্মৃতি রক্ষায় পরে নির্মিত নতুন ভবনটির নাম রাখা হয় অক্টোবর স্ট্মৃতিভবন। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর দিনটি ছিল শুক্রবার। ওই সময় বিটিভিতে চলত ধারাবাহিক নাটক 'শুকতারা'। ভবনটির দোতলায় ছিল হলের টিভি কক্ষ। 'শুকতারা' নাটক দেখার জন্য তখন হলের ছাত্র, কর্মচারী, অতিথিরা ভিড় করতেন। টিভি কক্ষে সেদিন উপস্থিত ছিলেন প্রায় ২৫০-৩০০ জন। ভবনে তখন মেরামত কাজ চলছিল।
জগন্নাথ হলের ওই ভবনটি ছিল প্রাদেশিক পরিষদের সংসদ ভবন। পরিষদ ভবনের টিভি কক্ষটিই এক সময় সংসদ কক্ষ হিসেবে ব্যবহূত হতো। কক্ষের সামনের যেদিকটা নিচু ছিল সেখানে রাখা ছিল টিভি। টিভির সামনের সমতল মেঝে চৌকির মতো রাখা ছিল। সেখানে বসতেন অনেকে। আর পেছনের দিকে চেয়ার সাজানো ছিল। সেখানে বসায় ছাত্রদের অগ্রাধিকার ছিল।
সেদিন আগে থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে ছাদের মাঝের অংশ ভেঙে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ধুলায় পুরো কক্ষ অন্ধকার হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩৪ জন। পরে মারা যান আরও ছয়জন। তাদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন ছাত্র। কর্মচারী ও অতিথি ছিলেন ১৪ জন।
ওই দুর্বিষহ স্ট্মৃতির সাক্ষী বর্তমানে হলের কর্মচারী সুশীল দাস। সেদিনের
স্ট্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, 'আমি চেয়ারে বসা ছিলাম। একজন ছাত্র এলে আমি তাকে চেয়ার ছেড়ে দিয়ে সামনে চৌকিতে বসি। এর মিনিটখানেক পর ছাদ ভেঙে পড়ে। পুরো টিভি কক্ষ ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায়। আমার ছেড়ে আসা সিটে বসা ছাত্রটি মারা যান। আমি সেখানে বসা থাকলে আজ আর আপনার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেতাম না।' সুশীল দাস ঘটনাক্রমে সেদিন সিট ছেড়ে সামনে গিয়ে বসায় আঘাত পেয়েছিলেন। তবে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।
ধসে পড়া ছাদের নিচে আটকা পড়ে আহত হন নিতাই চন্দ্র দাস। ১৫ অক্টোবরের স্ট্মৃতি স্ট্মরণ করে তিনি বলেন, 'আমি তখন হলের ক্যান্টিনে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ করতাম। নাটক দেখার জন্য আগেই কাজ শেষ করি। বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি একটু দেরি করে যাওয়ায় পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ বৃষ্টির মাত্রা বেড়ে যায়। তখনই ছাদের একটা বড় অংশ ভেঙে পড়ে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আমার জ্ঞান ফিরে আসে। আমার মাথায় আঘাত লাগে। হাসপাতালে আমার পাশে তখন অনেক লাশ রাখা ছিল।'
জগন্নাথ হলের কর্মচারী সদ্য অবসরে যাওয়া রাখাল চন্দ্র দাস। তার এক আত্মীয়ও সেদিন টিভি দেখতে গিয়ে মারা যান। তিনি বলেন, 'তখন আশপাশে আর কোনো টিভি ছিল না। আমার ওই আত্মীয়কে টিভি কক্ষে বসিয়ে দিয়ে আসি। এর ১৫ মিনিট পরেই ওই দুর্ঘটনা ঘটে।'
সেদিন হলের গেটে কর্মরত ছিলেন অরুণ চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, আমার চাকরি শুরুর এক বছরের মাথায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। টিভি কক্ষে ছাদের নিচে চাপা পড়ে যারা মারা যান, এর বাইরে আহতদের উদ্ধার উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়ে মারা গেছেন আরও দু'জন। এর মধ্যে একজন ছাত্র। তার নাম শান্তিপ্রিয় চাকমা। আরেকজন ছিলেন মুসলমান।
শোকে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছিল সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো দেশ। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নেপাল চন্দ্র দাস বলেন, 'হলের মাঠে সার বেঁধে লাশগুলো রাখা হয়েছিল। একদিকে চলছিল তাদের পরিচয় নির্ণয়ের কাজ, অন্যদিকে রক্ত দেওয়ার জন্য লোক সংগ্রহ। কেউ মেডিকেলে যাবে বললে রিকশাচালকরা ভাড়া নেননি সেদিন।'
জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি স্ট্মরণে অক্টোবর স্ট্মৃতিভবনের নিচতলায় রয়েছে একটি ছোট জাদুঘর। সেদিনের ব্যবহূত টিভি সেটটি রাখা আছে এই জাদুঘরে। ওই ট্র্যাজেডিতে মৃত্যুবরণ করা বেশ ক'জনের ছবিও সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবনটির সামনে নিহতদের স্ট্মরণে তাদের নাম সংবলিত একটি নামফলক স্থাপন করা হয়েছে।