'আরকান' এখন টেকনাফে

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭

আবদুর রহমান, টেকনাফ থেকে


গন্তব্য কোথায় জানা নেই কারও। তবুও ট্রাক ও চাঁদের গাড়িতে ওঠার জন্য হুড়াহুড়ি করছিলেন মিয়ানমার থেকে প্রাণে বেঁচে আসা রোহিঙ্গারা। মাঠে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে কানে আসে শিশুদের কান্নার শব্দ। আবার প্রচন্ড রোদে কেউ কেউ ক্যাম্পে আশ্রয় পেতে ট্রাকে উঠে বসে আছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ শিশু ও নারী। মাঠের পাশে তাঁবু টানিয়ে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে দেখা মেলে এমন চিত্র।
বর্তমানে রাখাইন মিয়ানমারের একটি প্রদেশ হলেও রোহিঙ্গাদের এই আবাসভূমি এক কালে ছিল স্বাধীন-স্বতন্ত্র রাজ্য। এই রাজ্যটিকে আরাকানও বলা হয়ে থাকে। আরাকানে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস অতি প্রাচীন। তাই রোহিঙ্গারা আরাকানকে খুব বেশি ভালোবাসে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই তো দেশের নামের সঙ্গে মিলিয়ে সন্তানের নাম রাখা হয়েছে 'আরকান'। গতকাল সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ত্রাণের লাইনে ক্লান্ত হয়ে বসেছিল সেই ৬ বছরের রোহিঙ্গা শিশু আরকান। এ সময় তার সঙ্গে কথা হয়। নাম কি জানতে চাইলে জবাবে উত্তর দেয়- 'আরকান'। শুনে একটু অবাক
হয়ে আবার জানতে চাইলে উত্তরে চিৎকার দিয়ে বলে, 'মর নাম আরকান।'
দেশের নাম কি প্রশ্ন করা হলে তাও বলে আরকান। কেন বাংলাদেশে এসেছে জানতে চাইলে উত্তরে চুপ হয়ে থাকে। তখন তার চোখেমুখে দেখা মেলে হতাশা, আতঙ্ক ও উদ্বেগ। তখন সামনে এগিয়ে এসে আরকানের মা পরিচয় দিয়ে ফাতেমা বেগম (৩০) নামে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, ও আমার সন্তান, বেশি কথা বলতে পারে না। কথা বলতে একটু সমস্যা হয়।
তাদের বাড়ি মিয়ানমারের মংডু মকনিপাড়া গ্রামে। সেখানে তাদের একটি কাঠের বাড়ি ছিল। ছিল সুখের সংসার, যা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে মিয়ানমার সেনারা। গত ২০ সেপ্টেম্বর স্বামী কামাল হোসেনকে সেনারা ধরে নিয়ে জবাই করে হত্যা করে, এরপর ছেলে আরকানসহ পাঁচ সন্তান নিয়ে গ্রামে গ্রামে পালিয়ে বেড়ান ফাতেমা। অবশেষে গতকাল নাফ নদ পাড়ি দিয়ে শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছান তারা।
স্বামী হারানো এ নারী বলেন, আমার জন্ম আরাকানে। তাই জন্মভূমিকে খুব বেশি ভালোবাসি। আমার স্বামীর জন্মও সেখানে। তার পাশে বসা তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে দেখিয়ে বলেন, তিনি খুব শখ করে এক ছেলের নাম রেখেছেন আরকান। কখনও চিন্তা করিনি, আমাদের আরাকান রাজ্যে ছেড়ে পালাতে হবে। যদি জানতাম, ছেলের নাম কখনও আরকান রাখতাম না।
ফাতেমা বলেন, সেনারা ওই গ্রামের শত শত শিশু, নারী ও পুরুষকে হত্যা করেছে। এপারে পালিয়ে আসার সময় পাহাড়ে, জঙ্গলে, খালে ও ধানক্ষেতে পড়ে থাকতে দেখেছি রোহিঙ্গাদের লাশ আর লাশ। কেন যেন মনে হচ্ছিল, এই যেন লাশের ভূমি। মকনিপাড়া গ্রামে প্রায় ৩০০ ঘরবাড়ি রয়েছে। দুটি মসজিদ, দুটি মাদ্রাসা ও তিনটি স্কুল রয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৫-৬টি ঘর ছাড়া বাকি ঘরগুলো ছাই হয়ে পড়ে আছে।
মিয়ানমারে সহিংসতা দেড় মাসের বেশি পার হয়ে গেলেও রোহিঙ্গারা নাফ নদ পাড়ি দিয়ে এখনও দলে দলে আসছে। গতকাল শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে দেড় হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।
সাবরাং হারিয়াখালী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। দলের প্রধান কর্মকর্তা লে. মেহেদী পিয়াস বলেন, শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ১২টি ট্রাক ও জিপে নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। তাদের ডাল, চিড়া, বিস্কুট, শিশুদের জন্য দুধ, কাপড় দেওয়া হচ্ছে এবং সরকারি-বেসরকারি সংগঠনগুলো চিকিৎসা দিচ্ছে।