বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস আজ

আলো ছড়াচ্ছেন পাপিয়া

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭

সৌরভ হাবিব ও আব্দুল লতিফ মিঞা, রাজশাহী ব্যুরো


গ্রামের শিশুদের বিনা পয়সায় পড়ান। কারো বাল্যবিয়ে হলে প্রতিরোধে সেখানেও ঝাঁপিয়ে পড়েন। অসুস্থ মানুষকে নিয়ে ছোটেন হাসপাতালে। এমন সব কাজ করেই বাঘার গ্রামে আলো ছড়াচ্ছেন তিনি। নিল্ফম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে পাপিয়া খাতুন। দুই বোন তিন ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ পাপিয়া। বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারীর কন্যা পাপিয়া রাজশাহী কলেজের ইতিহাস বিভাগ থেকে এ বছর এমএ পাস করেছেন।
পাপিয়া জানান, এসএসসি পরীক্ষার পর ফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত অবসর সময় ছিল। তখন বসে না থেকে গ্রামের শিশুদের পড়াতে শুরু করেন। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ৬ শিশুকে দিয়ে বাড়ির উঠানে পড়ানো শুরু। এরপর এসএসসি পাশ করে স্থানীয় কলেজে ভর্তি হন। দিনে দিনে শিক্ষার্থীও বাড়তে থাকে। বর্তমানে তার কাছে ১৫ শিক্ষার্থী বিনা পয়সায় পড়াশোনা করে। পাপিয়া জানান, তাদের মধ্যে অবস্থা ভালো পরিবারের কেউ কেউ মাস শেষে কিছু টাকা দেয়। ওই টাকা দিয়ে দরিদ্র শিশুদের খাতা-কলম কিনে দেন। গ্রামে বাল্যবিয়ের কথা শুনলে তা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এ পর্যন্ত তার প্রচেষ্টায় গ্রামের চারটি বাল্যবিয়ে বন্ধ হয়েছে। গ্রামের মানুষকে বাল্যবিয়ের কুফল সল্ফপর্কে সচেতন করার কাজটিও করেন তিনি।
পাপিয়া জানান, ২০১২ সালে পাকুরিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আরজিনার বিয়ে ঠিক হয়। শুনেই সেখানে ছুটে যান পাপিয়া। বিয়ের আগের দিন সকালে সেখানে আরজিনার পরিবারকে বাল্যবিয়ের কুফল সল্ফপর্কে বোঝানো হয়। এ সময় তিনি ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।
তার কথায় গুরুত্ব দেয়নি আরজিনার পরিবার। পরে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে থানায় খবর দেন। রাতেই পুলিশ বিয়ে বন্ধ করে। এরপর আরজিনা এসএসসি পাস করে। ২০১৩ সালে পাপিয়ার শিক্ষার্থী সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী আশার বিয়ে ঠিক হয়। সেখানেও ছুটে যান পাপিয়া। তার পরিবারকে বোঝালেন। এ সময় আশার পরিবার জানায়, আশা ভালো ছাত্রী নয়। পরিবারও গরিব। তাই বিয়েটা হলে ভালো হয়। এবারও আশার পরিবার বিয়ে বন্ধ করতে রাজি হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিক ও এনজিও কর্মীদের জানান পাপিয়া। সেই বিয়েটিও বন্ধ করে পুলিশ। পাকুরিয়া গ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আঁখি খাতুনের বিয়ে ঠিক করা হয় ২০১৩ সালের শেষের দিকে। এবারও পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে পাপিয়া তার বাল্যবিয়ে বন্ধ করে। গত বছর গ্রামের আরেক কিশোরী নবম শ্রেণির ছাত্রী লাকী খাতুনের বিয়ে বন্ধ করেন পাপিয়া; কিন্তু এক বছর পরই লাকী খাতুন নিজেই বিয়ে করে বসেন।
পাপিয়া খাতুন বলেন, 'মেয়েদের সুস্বাস্থ্য, পড়াশোনা ও স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে কাজ করছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল হতে পারছি না। মানুষের দরিদ্রতা, হতাশা ও সচেতনতা এর জন্য দায়ী।' পাপিয়া বলেন, 'গ্রামের অনেকেই এমএ পাস করে চাকরি পাচ্ছেন না। বয়স বেড়ে গেলে বিয়ে দিতেও সমস্যা হচ্ছে। শুধু বাল্যবিয়ে রোধ করতে গেলেই হবে না, শিক্ষিত মেয়েদের চাকরি দিয়ে স্বাবলম্বী করতে হবে।'
গ্রামের অপচিকিৎসা, কুচিকিৎসা থেকে মানুষকে সচেতন করতে পাপিয়া তাদের নিয়ে যান সরকারি হাসপাতালে। গ্রামের বৃদ্ধা হালিমা বেগম দীর্ঘদিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। গ্রামের ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ খেয়েই চলছিল তার দিন। পরে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন পাপিয়া। রক্ত পরীক্ষার পর জানা গেল তার টাইফয়েড হয়েছে। এমন অসংখ্য রোগীকে চিকিৎসা করিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে গ্রামের মেয়েরা তাদের নানা শারীরিক সমস্যার কথা এখন পাপিয়ার কাছে মন খুলে বলেন। তাদের চিকিৎসা পেতে সহযোগিতা করেছেন তিনি। পাপিয়া বলেন, গ্রাম্য চিকিৎসা বিষয়ে বাঘা উপজেলা সদরে দুই বছরের একটি কোর্স করেছিলাম। এই কোর্স করার পর চিকিৎসা বিষয়ে মানুষকে সহজেই ধারণা দিতে পারি।'
বাঘার পাকুরিয়া গ্রামের প্রধান আব্দুল খালেক জানান, সমাজের কুসংস্কার ভেদ করে সমাজ উন্নয়নে কাজ করছেন পাপিয়া। তাকে দেখে অনেকেই অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা স্ব-উন্নয়নের সমন্বয়কারী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, 'বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের কাজ করতে গিয়ে তার মাধ্যমে অনেক সংবাদ পেয়েছি। তিনি নিজেও অনেক সময় প্রতিরোধ করেছেন।' স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ বলেন, 'পাপিয়া বিনা বেতনে পাঠদান, হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাওয়া, বাল্যবিয়ের বিষয়ে গ্রামের মানুষকে সচেতন করার কাজ করছেন। এতে আমাদের কাজও অনেকটা সহজ হচ্ছে।' পাকুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফকরুল হাসান বাবুল বলেন, 'সমাজ উন্নয়নে মেয়েটি এসব কাজ করেছে। তরুণ প্রজন্মের জন্য এটা খুব ভালো উদাহরণ।'
গত শুক্রবার পাপিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ঘরের বারান্দায় গ্রামের শিশুদের পড়াচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা জানালেন, স্কুলের পড়া বুঝিয়ে দেওয়ায় তাদের পরীক্ষার ফল এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়।