দীর্ঘমেয়াদি বসবাসে মজবুত ঘর তৈরি!

রাখাইনে ফেরা নিয়ে শঙ্কা

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭

আবু তাহের, উখিয়া থেকে


মিয়ানমারের মংডু মাইজপাড়া থেকে পালিয়ে এসে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের 'ডি' ব্লকে আশ্রয় নিয়েছে হেলাল উদ্দিনের (৩৪) আট সদস্যের পরিবার। এত দিন এই রোহিঙ্গা পরিবার ছিল পলিথিনের বেড়া ও ছাউনি দিয়ে তৈরি অস্থায়ী একটি ঝুপড়ি ঘরে। গতকাল শনিবার সকালে গিয়ে দেখা গেল, হেলাল উদ্দিন তার ঝুপড়ি ঘর ভেঙে ফেলেছেন। সেখানে বাঁশের খুঁটি দিয়ে মজবুত করে তৈরি করছেন নতুন একটি ঘর। নতুন ঘর কেন- জিজ্ঞাসা করতেই তার উত্তর, 'কত দিন এখানে থাকতে হবে, জানি না। তাই ঘরটি একটু মজবুত করে তৈরি করছি।'
হেলাল উদ্দিনের মতো এখানে বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া সব রোহিঙ্গা তাদের স্বদেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তায়। তাদের মনে শঙ্কা-ভয়, আদৌ কি ফিরে যেতে পারবেন নিজ দেশে? ফিরতে পারলেও সহসা যে হচ্ছে না, সেটাও তাদের বদ্ধমূল ধারণা। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা মনে করছেন, অতীতের মতো তাদের দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে থাকতে হবে। তাই এদের অনেকেই এখন মনোযোগী হচ্ছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই ঘরটি যথাসম্ভব মজবুত করে তৈরি করতে।
ক্যাম্পেই কথা হলো মংডুর মেরুল্লা থেকে পালিয়ে আসা মাদ্রাসা শিক্ষক মৌলানা আজিজের সঙ্গে। তিনি জানালেন, মিয়ানমার সরকার একদিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছে, অন্যদিকে এখনও রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করছে। এই মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, 'সমাধান যার হাতে, মিয়ানমারের সেই সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হদ্মাইং এখনও বলছেন, রোহিঙ্গারা সে দেশের নাগরিক নয়। তারা বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালি। এর থেকে পরিস্কার ধারণা হয়, মিয়ানমার সরকার আলোচনার নামে কূটকৌশল করছে। তারা রোহিঙ্গাদের কখনও ফিরিয়ে নেবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'হাজার বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। অতীতে মিয়ানমার পার্লামেন্টে আমাদের প্রতিনিধিও ছিল। ১৯৮২ সালে আমাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয় সামরিক জান্তা সরকার।' তিনি বলেন, 'আমরা যারা আরাকানের আদি বাসিন্দা, তারা হলাম বহিরাগত। আর রাখাইন বৌদ্ধ যারা অন্য দেশ থেকে এসেছে, তারা হয়েছে সে দেশের নাগরিক। সত্যিই, দুর্ভাগা জাতি
রোহিঙ্গা।'
মিয়ানমারের ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী উন মিয়াত আয়ে শুক্রবার বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনতে ১০ বছর সময় লাগবে। প্রতিদিন বড়জোর ১০০-১৫০ রোহিঙ্গা ফেরত নেবে। যারা যাবে, তাদের বাড়িঘরে ফিরতে দেওয়া হবে না। অস্থায়ী ক্যাম্পে রাখা হবে। মিয়ানমারের শীর্ষ মন্ত্রীর এই কথায় চরম হতাশা প্রকাশ করলেন কুতুপালং ক্যাম্পের সভাপতি আবু সিদ্দিক। এই রোহিঙ্গা নেতা বলেন, 'মিয়ানমার মন্ত্রীর এ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তারা রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরতে দেবে না।'
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালেও আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল। দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় তাদের প্রত্যাবাসন সম্পম্ন করতে দেয়নি মিয়ানমার সরকার। এর ওপর নতুন নতুন সংকট তৈরি করে ফের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, রাখাইনকে রোহিঙ্গাশূন্য করতে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করছে মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী।
রোহিঙ্গা নেতা আবু সিদ্দিক বলেন, 'মিয়ানমার সরকারের ওপর আমাদের আর আস্থা নেই। নাগরিক অধিকারসহ পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে রোহিঙ্গারা আর স্বদেশে ফিরে যাবে না।'
একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএমের কর্মকর্তা ও সমন্বয়কারী সৈকত দাশ। তিনি বলেন, 'রাখাইনে যেভাবে হত্যাযজ্ঞ, রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতা চলছে, এই সংকট সমাধানে মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ পাওয়া যায় না।'
তিনি আরও বলেন, রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যাতে সেখানে ফেরত যেতে না চায়, সে জন্য সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত অভিযান চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। সেখানে নৃশংসতা এত বেশি হয়েছে যে রোহিঙ্গাদের ফেরানো অসম্ভব। এখনও যারা সেখানে রয়ে গেছে, তারা দলে দলে পালিয়ে আসছে। তিনি বলেন, ২৫ আগস্টের পর থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
এদিকে, গতকাল শনিবারও সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, রাখাইন প্রদেশের মংডু সমুদ্রসৈকতে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে প্রায় চার হাজার রোহিঙ্গা। আহলেই থান কিয়া সৈকতেও রয়েছে দুই হাজারের মতো। তারা নৌকার সন্ধানে রয়েছে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দিতে।