অ্যামোনিয়া গ্যাসের অভাবে হিমায়িত মৎস্য খাতে সংকট

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭

মিরাজ শামস


অ্যামোনিয়া গ্যাসের অভাবে হিমাগারে মাছ সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া কৃষিপণ্যও হুমকির মুখে। অ্যামোনিয়া গ্যাস ছাড়া মৎস্য ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা যায় না। এই গ্যাস রেফ্রিজারেটরের মতো হিমায়িত পণ্য দীর্ঘকাল ঠান্ডা রাখে। দেশের সার কারখানাগুলো থেকে প্রায় এক মাস ধরে অ্যামোনিয়া গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানি।
ঘাটতির কারণে অ্যামোনিয়া গ্যাসের দাম বেড়েছে সাত গুণ। বর্তমানে ৫০ কেজি ওজনের প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায়, যা আগে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা ছিল। মৎস্য খাতে বছরে প্রায় ৭ হাজার সিলিন্ডার গ্যাসের প্রয়োজন হয়। মৎস্য রফতানিকারকদের অভিযোগ, এখন সংকট সৃষ্টি হওয়ায় ডিলার ও পরিবেশকরা অ্যামোনিয়া গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দাম না কমানো হলে হিমায়িত মৎস্য রফতানি ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে।
হিমায়িত মৎস্য রফতানি খাতের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) সংকট নিরসনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। গতকাল শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর কাছে লেখা এক চিঠিতে সংগঠনের সভাপতি আমিন উল্লাহ জানান, শতভাগ রফতানিমুখী হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করতে সার্বক্ষণিক অ্যামোনিয়া গ্যাস প্রয়োজন। মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে কোল্ড চেইন ছাড়া সম্ভব নয়। এ জন্য অ্যামোনিয়া গ্যাস ছাড়া কারখানা অচল। সংকট মোকাবেলায় মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু মাছ নয়; অ্যামোনিয়া গ্যাসের অভাবে চার শতাধিক
আলুর হিমাগার ও কয়েক হাজার বরফকল বিপাকে পড়তে যাচ্ছে। এ ছাড়া হিমাগারে সংরক্ষণ করা ফলসহ নানা কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তারা বলেন, এক মাস ধরে অ্যামোনিয়া গ্যাস সংকট চলছে।
বিএফএফইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাজী বেলায়েত হোসেন সমকালকে বলেন, বাড়তি টাকা দিলে অ্যামোনিয়া গ্যাসের সিলিন্ডার মিলছে। অনেক জায়গায় পাওয়াও যাচ্ছে না।
জানা যায়, ইউরিয়া সার তৈরির মূল উপাদান অ্যামোনিয়া গ্যাস। সার কারখানাগুলো কিছু পরিমাণ অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপাদন করে। আগে ইউরিয়া সার প্রস্তুতের পর বাড়তি অ্যামোনিয়া গ্যাস বায়ুম লে ছেড়ে দেওয়া হতো। এতে আশপাশের পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ কারণে ২০১৪ সাল থেকে সিলিন্ডারে ভরে অ্যামোনিয়া গ্যাস বিক্রি শুরু হয়। বর্তমানে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল), ঘোড়াশাল, পলাশ, আশুগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় অ্যামোনিয়া উৎপাদন বন্ধ আছে। উৎপাদন চলছে শুধু যমুনা ও শাহজালাল সার কারখানায়। সার কারখানা থেকেই ডিলারদের মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ অ্যামোনিয়া গ্যাস সরবরাহ করা হয়। দেশের সার কারখানাগুলো বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থার (বিসিআইসি) অধীন।
যমুনা সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক খান জাবেদ আনোয়ার সমকালকে বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় এখন অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপাদন কম হচ্ছে। অ্যামোনিয়া গ্যাস থেকে চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে প্রায় এক মাস ধরে সিলিন্ডারে অ্যামোনিয়া গ্যাস বিক্রি বন্ধ আছে। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসের যে চাপ রয়েছে, তাতে ঝুঁকি নিয়ে কারখানা চলছে। এভাবে গ্যাসের ঘাটতি হলে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। এখন কেবল ইউরিয়া সার উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
জানা গেছে, দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ অবদান মৎস্য খাতের। দেশে ১৪৩টি মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা থেকে মাছ রফতানি হচ্ছে। গত অর্থবছরে হিমায়িত মৎস্য খাত থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি রফতানি আয় হয়। মাছ রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৮ হাজার টন। চলতি অর্থবছরের তিন মাসে রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার। হিমায়িত মাছ রফতানি গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে এবার ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, বিদ্যমান সংকট কাটানো সম্ভব না হলে মাছ রফতানি সংকটে পড়বে।