পুলিশকে বিভ্রান্ত করার কৌশল নেয় খুনিরা

চট্টগ্রামে সুদীপ্ত হত্যা

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭

আবদুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম ব্যুরো


চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার দৃশ্য ভিডিও করেছিল খুনিরা। কিলিং মিশনে অংশ নিয়েছিল ছয়জন। ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে ছিল অন্তত ৩০ জন। বাধা এড়াতে দক্ষিণ নালাপাড়া সড়কের দুই মুখে দেওয়া হয়েছিল ব্লক। পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে অংশ নিয়েছিল বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি গ্রুপ। তবে খুনের নির্দেশদাতা ছিল একজনই। সেই গডফাদারকেও শনাক্ত করেছে পুলিশ। এদিকে, সুদীপ্ত হত্যার আট দিন পর খুনের সঙ্গে জড়িত মোহাম্মদ মোক্তার হোসেন (২৯) নামের একজনকে গত শুক্রবার মধ্যরাতে গ্রেফতার করে পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এক গডফাদারের সার্বিক পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস খুন হন বলে জানিয়েছে মোক্তার। ওই গডফাদার সরকারদলীয় নেতা হওয়ায় মামলার নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে তার নাম প্রকাশ করতে চাইছে না পুলিশ। এ ছাড়া হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ জড়িত আরও পাঁচজনের নামও মিলেছে। তারা হলো নগরের লালখান বাজার এলাকার যুবলীগ নেতা মাঈনুদ্দিন হানিফ, আইনুল কাদের চৌধুরী নিপু, জাহেদুর রহমান জাহেদ, রুবেল দাশ ও জিহাদ। তারা লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুমের অনুসারী। তবে এ হত্যাকান্ডে তার অনুসারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন মাসুম।
নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোক্তার স্বীকার করেছে, সক্রিয়ভাবে সে এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। কয়েকজনের জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তার ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, মোক্তার হোসেন কুমিল্লা জেলার তিতাস থানার দক্ষিণ বলরামপুর গ্রামের মোসলেম উদ্দিন ভূঁইয়ার ছেলে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকত নগরের টাইগারপাস এলাকায় রেলওয়ে কোয়ার্টারে। নগরের হালিশহর বড়পোল এলাকায় গাড়ি মেরামতের একটি গ্যারেজ রয়েছে তার। গত শুক্রবার রাতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ভোলায় পালানোর সময় বড়পোল এলাকায় একটি বাস কাউন্টার থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোক্তার হোসেন পুলিশকে জানিয়েছে, গত ৬ অক্টোবর সকালে সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালাপাড়া সুদীপ্ত বিশ্বাসের বন্দনা কুঠিরের বাসার সামনে তিনটি মোটরসাইকেলে যায় ছয়জন।
তাদের মধ্যে একজন মোক্তার হোসেন। কোনো প্রতিরোধ এলে তা ঠেকাতে ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে ছিল আরও অন্তত ছিল ৩০ জন, যারা ১২-১৩টি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সদরঘাটের নালাপাড়ায় গিয়েছিল। তারা দক্ষিণ নালাপাড়া সড়কের দুই মুখে ব্লক দেয়। আগের দিন রাত ৯টার দিকে
তাকে পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। সুদীপ্তকে আগে থেকে চিনত না সে। তবে নির্দেশদাতার সঙ্গে শত্রুতা ছিল সুদীপ্তের।
নগর পুলিশের উপকমিশনার এস এম মোস্তাইন হোসেন বলেন, 'পূর্বশত্রুতার জের ধরে এই খুনের ঘটনা। শত্রুতা মোক্তারের সঙ্গে ছিল না। সে যাদের নাম বলেছে, তাদের সঙ্গে শত্রুতা ছিল। সে মূলত তাদের পক্ষে খুন করতে গিয়েছিল।' পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, 'সুদীপ্তকে খুনের সময় দৃশ্য ধারণ করেছিল খুনিরা। একটি ভিডিও ক্লিপ পুলিশের হাতে এসেছে। কারা কীভাবে খুন করেছে, তা এখন পুলিশের কাছে পরিস্কার। খুনের নির্দেশদাতাকেও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।'
সূত্র জানায়, সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যার পুরো পরিকল্পনা হয় লালখান বাজার এলাকার গডফাদার হিসেবে পরিচিত এক আওয়ামী লীগের নেতার কার্যালয়ে। খুনের আগের দিন ওই নেতার কার্যালয়ে বসে খুনের ছক কষে তারা। খুনে যারা অংশ নিয়েছিল ও যারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিল, তারা ওই দিন রাতে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির মালিকানাধীন মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় রাতযাপন করে। পরের দিন সকালে তিনটি মোটরসাইকেল ও একাধিক সিএনজি অটোরিকশায় করে তারা ঘটনাস্থলে যায়।