নাটেশ্বর দেউল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রত্ন আবিস্কারের একটি

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০১৮

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু, মুন্সীগঞ্জ



মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বর দেউল পৃথিবীর সেরা প্রত্নতাত্ত্বিক আবিস্কারগুলোর একটি। বাকি খনন কাজ শেষ হলে শতাব্দী প্রাচীন এই বৌদ্ধ নগরী 'বিশ্বঐতিহ্যে'র তালিকাভুক্ত হবে। এ ছাড়া বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি বিক্রমপুর দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবেও জায়গা করে নেবে। গতকাল শনিবার বিকেলে নাটেশ্বর গ্রামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক নূহ-উল আলম লেনিন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সম্মানিত অতিথি ছিলেন মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের এমপি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, চীনের হুনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক জিন জুং, পরিচালক গু ওয়াইমিন ও হুনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ব্যুরোর চিফ চি ইউবিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশীদ, মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, টঙ্গিবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার। সংবাদ সম্মেলনের আগে অতিথিরা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ঘুরে দেখেন।

সংবাদ সম্মেলনে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পিরামিড আকৃতির নান্দনিক স্তূপটির পূর্ব বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৪ মিটার। এর মধ্যে ৪২ মিটার দৈর্ঘ্যের উত্তর ও দক্ষিণ বাহুর অংশবিশেষ উন্মোচিত  হয়েছে। অবশিষ্ট মণ্ডপসহ অষ্টকোণাকৃতির তিনটি স্তূপের খনন বাকি আছে।

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২৫ দশমিক ২ মিটার আয়তনের কেন্দ্রীয় স্তূপ (প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ২ মিটার, কোণাকুণি বাহুর দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৬ মিটার), বাংলাদেশের বজ্রমান বৌদ্ধ মতবাদের ক্রুশাকৃতির কেন্দ্রীয় মন্দির হিসেবে পরিচিত। আট সংখ্যার প্রাধান্য থাকায় অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ আবিস্কারটি অষ্টমার্গ স্তূপ। কারণ বৌদ্ধধর্মে অষ্টমার্গ যেমন- চিন্তা, সৎ কর্ম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও জানান, প্রত্নতত্ত্ব খনন কাজে অন্যান্য আবিস্কার হলো- পূর্ব দিকে প্রবেশপথসহ ১১ মিটার/১১ মিটার আয়তনের একটি কক্ষ, উত্তর দিকে প্রবেশপথসহ ৭টি মিটার/ ৭ মিটার আয়তনের একটি কক্ষ, তদসংলগ্ন ইট বিছানো মেঝেসহ ৪ দশমিক ৮ মিটার এবং ২ দশমিক ৪ মিটার আয়তনের একটি কক্ষ। দক্ষিণ দিকে প্রবেশপথসহ আরও একটি কক্ষ সম্প্রতি আবিস্কৃত হয়েছে। এ পর্যন্ত আবিস্কৃৃত প্রত্নবস্তুর ভিত্তিতে বলা যায় যে, স্তূপ কমপ্লেক্সের মূল প্রবেশপথটি ছিল উত্তর দিকে। এর আগে আবিস্কৃত কারুকার্যময় মন্দির ও সীমানা প্রাচীরটিও উল্লেখযোগ্য।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৩-২০১৮ উৎখননে ৫ হাজার বর্গমিটারের বেশি এলাকা উন্মোচিত হয়েছে এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রত্নবস্তু আবিস্কৃত হয়েছে। আমেরিকার বেটা পরীক্ষাগারে ২৬টি কার্বন-১৪ পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পরীক্ষার মাধ্যমে নাটেশ্বর বৌদ্ধ বসতির দুটি সময়কাল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রথম পিরিয়ড ৭৮০-৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ, যা শুরু হয়েছিল দেব রাজবংশের সময় (৭৫০-৮০০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং টিকে ছিল চন্দ্র রাজবংশ (৯০০-১০৫০) পর্যন্ত। নাটেশ্বর বৌদ্ধ বসতির দ্বিতীয় পিরিয়ড হলো ৯৫০-১২২৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত, যা চন্দ্র, বর্ম (১০৮০-১১৫০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং সেনদের (১১০০-১২২৩ খ্রিষ্টাব্দ) শাসন পর্যন্ত টিকে ছিল। তাম্রশাসন অনুসারে চন্দ্র, বর্ম ও সেনদের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মস্থান বিক্রমপুরের নাম পাওয়া যায় তিব্বতের ঐতিহাসিক সূত্রে।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ওয়ারী বটেশ্বরের ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে ষষ্ঠ শতাব্দীতে শুরু হয়েছে। সেই ওয়ারী বটেশ্বরের পরই বিক্রমপুরের নাটেশ্বর। তিনি বলেন, হাজার বছর আগের পুরনো শহর নাটেশ্বরকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। সে সঙ্গে এই প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করতে হবে।