সাক্ষাৎকারে অ্যামনেস্টি মহাসচিব

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

বাংলা ট্রিবিউন

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে মিয়ানমার কোনো যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে মনে করছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব সলিল শেঠি। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনও কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে এক সাক্ষাৎকারে জোর করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন অ্যামনেস্টি মহাসচিব। সলিল শেঠি বলছেন, বাংলাদেশকে অন্তত দুই থেকে তিন বছরের জন্য ওই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর জীবনমান ও শিক্ষা নিশ্চিতের পথ খুঁজে বের করতে হবে। তিনি জানান, এখনও রোহিঙ্গারা রাখাইনকেই তাদের আবাস মনে করে। তাই কার্যকর চাপ

প্রয়োগ করলে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলো দেখে প্রাথমিকভাবে কী মনে হয়েছিল- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বহুদিন ধরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে অ্যামনেস্টি কাজ করছে। মনে করি, একটা দীর্ঘকাল ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে যাচ্ছে। গত বছরের আগস্টে যা ঘটেছে, সেটাকে বলতে পারেন একটি বড় পরিসরের জাতিগত নিধন। আমরা সেই নিধনযজ্ঞকে নথিভুক্ত করেছি। কেবল প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য-প্রমাণকে উপজীব্য করে সেসব নথি তৈরি করিনি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনার ভিডিও ও স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করেছি। দেখেছি কি নগ্ন নির্যাতন-নিপীড়ন সেখানে হয়েছে। এসব ঘটনার বিবরণ পাঠ করা, কিংবা একটা দূরবর্তী অবস্থান থেকে সেগুলোর ভিডিও-স্থিরচিত্র দেখা এবং দুনিয়ার বিভিন্ন অংশেও একই রকম ঘটছে জানার পরও একেবারে প্রত্যক্ষভাবে শরণার্থী শিবিরে যাওয়াটা একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ব্যাপার। মনে হয়, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে সেটা একেবারে স্বতন্ত্র ব্যাপার। কাঠামোগত জাতিবিদ্বেষের এক প্রক্রিয়া থেকে এর শুরু। বলতে পারি, দশকব্যাপী জাতিবিদ্বেষ। তবে শিবিরে যাওয়াটা আমার জন্য একটা শক্ত অভিজ্ঞতাই ছিল।

মিয়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর চাপ বাড়াতে অ্যামনেস্টির ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সেটাই আমাদের মনোযোগের মূল জায়গা। মিয়ানমারসহ সারা বিশ্বেই অ্যামনেস্টি কাজ করছে। রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়নে সে দেশের সরকারকে দায়দায়িত্বের কথা বলে যাচ্ছে। সম্ভাব্য সব পথেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল, নিরাপত্তা পরিষদের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতসহ সম্ভাব্য সব আইনি পথেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মিডিয়া প্রচারণার মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার চেষ্টাও করছি।

মিয়ানমার কোনো চাপ বোধ করছে কিনা- এমন প্রশ্নে সলিল শেঠি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, তারা চাপ বোধ করছে না। এর মানে হলো, প্রচেষ্টাকে চার গুণ বাড়াতে হবে। রোহিঙ্গাদের ভাগ্য বদলের সামর্থ্য তাদের নিজেদের নেই। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে

কাজ করতে গিয়ে একটি ব্যাপার টের পেয়েছি। বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে, রোহিঙ্গা নারীদের সঙ্গে কথা বলে আমরা দেখেছি, দিন শেষে রাখাইনই তাদের কাছে শেষ কথা। আর কোথাও তাদের ঘরবাড়ি নেই। তাই সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, তারা সেখানে ফিরতে চায়। কথা হলো, সেখানকার বাস্তবতা ফেরার পক্ষে অনুকূল কি-না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটা কথা বলছি- নিরাপত্তা, জীবনমান, ভূমি, আবাসন, খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে জাতিগত পরিচয় কিংবা নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া, ধর্মীয় ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিতে মিয়ানমারকে যথাযথ চাপ প্রয়োগ করতে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীসহ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এসব অপরিহার্যতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। সেটা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারি। মিয়ানমারের সঙ্গেও সরাসরি কথা বলছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও এসব প্রশ্নে অবিচল থাকা উচিত। এতে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে না? দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব বহনের একটা বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে না- এমন প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, একদিক থেকে এটা ঝুঁকি বটে। তবে অন্যদিক থেকে দেখলে আমি চাই না, বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষের মতো বিপণ্ণ কাউকে রাখাইনে ফিরে গিয়ে আবারও একই ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতনের মুখে পড়তে হোক। তাই একদিক থেকে এটা ঝুঁকি হলেও আমাদের প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত নিশ্চিতের দাবি জোরালো করা উচিত।

মিয়ানমারকে চাপে ফেলা খুব সহজ নয়, কেননা তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে অভ্যস্ত। আর সু চি নয়, দেশটা নিয়ন্ত্রণ করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সুতরাং কী করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে হুমকির মুখে ফেলা যায়, সেদিকেই মনোযোগী হতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলার মতো কিছু করেছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন- না, মোটেও করেনি। আমার মনে হয়, আরও অনেক কিছু করার আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে যৌথতার ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি, সামরিক কর্তৃপক্ষের একাংশের ওপর চাপ বাড়াতে সুনির্দিষ্ট কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। তবে এমন কোনো চাপ এখনও সৃষ্টি করা যায়নি, যাতে পরিস্থিতির বদল ঘটবে। বাণিজ্য খাত কিংবা অর্থ খাতে চাপটা হতে হবে সর্বাত্মক, যেন মিয়ানমার সরকার সেই চাপের কারণে তাদের সংঘটিত কর্মকাে র ভয়াবহতার ব্যাপারে সচেতন হয়। দুঃখজনক হলো, মিয়ানমার সেটা ভালো করে অনুভব করছে না। কয়েক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতির নাটকীয় কোনো পরিবর্তন ঘটে যাবে; আমি তা মনে করি না। প্রক্রিয়াটা ধীরগতিরই হবে। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেওয়ার উপায় নিয়ে বাংলাদেশকে ভাবতে হবে। মানবিক সহযোগিতার চেয়েও বেশি কিছু নিয়ে ভাবতে হবে বাংলাদেশকে। ব্র্যাকের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত আমাদের গবেষণা অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি গভীর। জনগণ এটাকে একটা সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখছে না এবং একটা দীর্ঘ সময় ধরে এই সমস্যার মধ্য দিয়ে দেশকে যেতে হবে।