চট্টগ্রামে এক ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে ৪৩ পরোয়ানা

৬০০ কোটি টাকা নিয়ে আড়াই বছর 'নিখোঁজ'

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম ও সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড

চট্টগ্রামে এক ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে ৪৩ পরোয়ানা

সীতাকুণ্ডে ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন কুসুমের সুদৃশ্য এই কার্যালয় দখলে নিতে মরিয়া পাওনাদাররা - সমকাল

চট্টগ্রামে ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা নিয়ে আড়াই বছর নিখোঁজ এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ৪৩ বার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এতবার ওয়ারেন্ট জারি হওয়ার ঘটনা চট্টগ্রামে এটিই প্রথম। তবে একের পর এক পরোয়ানা নথিভুক্ত হলেও হদিস মিলছে না অভিযুক্ত ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন কুসুমের। তার পরিবারের দাবি, পাওনাদাররা কুসুমকে ঢাকা থেকে অপহরণ করেছে। সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ বলছে, ঋণখেলাপি হয়ে এবং দেনা পরিশোধ না করতেই ব্যবসায়ী কুসুম আত্মগোপনে রয়েছেন। তাকে খোঁজা হচ্ছে।

এদিকে কুসুম নিখোঁজ থাকায় অর্ধশত পাওনাদার যে যার মতো করে কুসুমের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন। তার বাড়ি, অফিস ও শিপইয়ার্ড নিলামে তোলার প্রক্রিয়ায় আছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন ব্যাংক, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কুসুমের কাছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পাবে।

এ প্রসঙ্গে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হাসান বলেন, 'ব্যবসায়ী গিয়াসের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালত থেকে একের পর এক ওয়ারেন্ট আসছে সীতাকুণ্ড থানায়। তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৪৩টি ওয়ারেন্ট নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু আত্মগোপনে থাকায় তাকে গ্রেফতার করতে পারছি না।' তবে গিয়াসউদ্দিন কুসুমের ভাই জসিম উদ্দিন বলেন, 'আমার ভাই কুসুমকে আরও আড়াই বছর আগে পাওনাদাররা অপহরণ করেছে। সে এখন কোথায় আছে তা আমার জানা নেই। ঢাকার উত্তরা থানায় অপহরণ মামলা করার পরও আমার ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাইনি।'

ব্যাংক কর্মকর্তারাও মনে করছেন ঋণখেলাপি হওয়ায় আত্মগোপনে আছেন ব্যবসায়ী কুসুম। এ প্রসঙ্গে ব্যাংক এশিয়ার ভাটিয়ারী শাখার ম্যানেজার সুলতান আলাউদ্দিন কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে এ শাখা থেকে সম্প্রতি বদলি হওয়া ম্যানেজার মিজানুর রহমান বলেন, 'ব্যবসায়ী কুসুমের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের পাওনা রয়েছে ১০৫ কোটি টাকারও বেশি। টাকা তুলতে তার ইয়ার্ডে থাকা জাহাজ আদালতের মাধ্যমে নিলামে তুলেছি আমরা। এ থেকে পাওয়া গেছে ৬২ কোটি টাকা। আর তার ইয়ার্ড বিক্রি করা হয়েছে ১১ কোটি টাকায়। একাধিক পাওনাদার থাকায় ৫৩ কোটি টাকা সমন্বয় করতে পারব আমরা। তবে জাহাজ বিক্রির টাকা এখনও আমাদের অ্যাকাউন্টে আসেনি।'

আট আদালতে ৪৩টি পরোয়ানা :সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তুলাতলী গ্রামের মোহাম্মদ মিয়ার ছেলে গিয়াস উদ্দিন ওরফে কুসুম। তার এ ঠিকানায় চট্টগ্রামের আটটি আদালত ৪৩টি ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছেন। এর মধ্যে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ১৩টি, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ১৩টি, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পাঁচটি, চিফ মেট্রোপলিটন আদালত পাঁচটি, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত তিনটি, যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত দুটি, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত একটি এবং সিএমএম আদালত থেকে পাঠানো একটি পরোয়ানা সীতাকুণ্ড থানায় নথিভুক্ত হয়েছে।

১১ বছরে 'আঙুল ফুলে কলাগাছ'

স্থানীয়রা জানান, ১১ বছর আগেও 'নুন আনতে পান্তা ফুরোয়' অবস্থা ছিল কুসুমের। তবে এক যুগের কম সময়ে 'আঙুল ফুলে কলাগাছ' হয়েছেন তিনি। ২০০৭ সালে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে বাড়ির কাছে পোলট্রি ফার্ম দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। পরে স্ট্ক্র্যাপ লোহার ব্যবসায় যুক্ত হন। এক সময় নিজে মালিক হন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের। এরপর ব্যাংকগুলো তাকে অকাতরে ঋণ দিতে থাকে। এখন বিভিন্ন ব্যাংক কুসুমের কাছে পাবে ২৫০ কোটি টাকার ওপরে। স্ট্ক্র্যাপ ব্যবসায় সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পাবে আরও প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। পাওনাদারদের টাকা নিয়ে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একবার হঠাৎ করে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে এবং পরে সেখান থেকে কানাডা গিয়ে গা-ঢাকা দেন। কয়েক মাস পর দেশে ফিরে আসেন। পাওনা টাকা পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে আবার ব্যবসা শুরু করেন। এর মধ্যে আবার ২০১৫ সালের জুলাই থেকে উধাও হয়ে যান তিনি। এখনও তাকে খুঁজে পায়নি পুলিশ।

সম্পত্তি নিয়ে পাওনাদারদের টানাটানি

চট্টগ্রামের ব্যাংক এশিয়া ভাটিয়ারী শাখা ব্যবসায়ী কুসুমের কাছ থেকে ঋণের ১০৫ কোটি টাকা পাবে। একই এলাকার যমুনা ব্যাংক পাবে ১২ কোটি টাকা। এ ছাড়া এবি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকেও তার ঋণ আছে। ব্যাংকের বাইরে ৫০ জনের বেশি ব্যবসায়ীও কুসুমের কাছ থেকে পাবে প্রায় আড়াইশ' কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণের ঋণ ও দেনা আদায় হওয়ার আগে হঠাৎ করে কুসুম উধাও হওয়ায় পাওনা টাকা উদ্ধারে এখন তার সম্পত্তি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ী কুসুমের সম্পদের মধ্যে সীতাকুণ্ড এলাকায় আছে একটি সুদৃশ্য বাড়ি এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শাহ আমানত আয়রন মার্ট ও আল মদিনা এন্টারপ্রাইজের অত্যাধুনিক অফিস। এর বাইরে ১৭১ দশমিক ১১ শতক ভূমি আছে তার। এসব বিক্রি করে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করছে সংশ্নিষ্টরা।