মৌসুমের শুরুতেই ইলিশের আকাল

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০১৮

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

পহেলা জুলাই শুরু হওয়া ইলিশ মৌসুম এক মাস অতিক্রম করল। কিন্তু প্রথম মাসেই জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা না পড়ায় হতাশা বিরাজ করছে জেলেপাড়ায়। যদিও মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তারা এখনও আশা ছাড়েননি। তাদের মতে, আসন্ন অমাবস্যার পর অর্থাৎ আগস্টের মধ্যভাগ থেকেই ইলিশের বিচরণ বৃদ্ধি পাবে নদ-নদীতে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়বে। তবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫ লাখ টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কি-না, তা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ইলিশ বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণের নদ-নদীতে নাব্য হ্রাস, পদ্মা সেতুসহ ইলিশের অভয়াশ্রম সংলগ্ন নদীতীরে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন- এ তিন কারণে ইলিশ তার গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

'গাঙ্গে ইলিশের এইরহম আহাল আগে দেহি নাই'- নদ-নদীতে কী রকম ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে জানতে চাওয়া হলে উপকূলের প্রায় সব জেলে এ রকম অভিন্ন ভাষায় উত্তর দেন। জেলেদের এ আক্ষেপের সত্যতা মেলে মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যসূত্রে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত জুলাই মাসে বিভাগে ১০ হাজার ৬০০ টন ইলিশ আহরিত হয়েছে। অথচ গত বছর (২০১৭) জুলাই মাসে এর পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৫৭৪ টন; ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ১৬ হাজার ৭৭৫ টন। দুই বছরের ব্যবধানে এ বছর জুলাইতে ৬ হাজার ১৭৫ টন কম পরিমাণ ইলিশ আহরিত হয়। গত এক মাস ধরে ইলিশ সংকটের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের খুচরা বাজারে মাঝারি সাইজের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।

ইলিশ কম ধরা পড়ার কারণ জানতে চাইলে মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেন, জলবায়ুর বৈশ্বিক পরিবর্তন হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে আগস্টের পরে সাগর ছেড়ে নদীতে প্রবেশ করছে ইলিশ। মৎস্য অধিদপ্তরের ক্যালেন্ডারে ১ জুলাই থেকে ইলিশ মৌসুম শুরু হলেও মূলত আগস্টের শেষভাগ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নদ-নদীতে সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। গোটা বছরের লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশের বেশি ইলিশ পাওয়া যায় এই সময়েই।

এ বক্তব্যের সপক্ষে অনেক যুক্তি দেখান পটুয়াখালী সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন আষাঢ় মাস থাকে বৃষ্টিহীন, ভাদ্র মাসে বৃষ্টি হয়, সাগরে ঢেউয়ের পরিমাণ, লবণাক্ততা- সবকিছুতেই পরিবর্তন হয়েছে। এর প্রভাবে ইলিশও তার বিচরণে পরিবর্তন এনেছে। সাগরে প্রচুর ইলিশ রয়েছে। সবেমাত্র সাগর ছেড়ে কলাপাড়া সংলগ্ন রামনাবাদ,

আন্ধারমানিক নদীতে ইলিশ ঢুকতে শুরু করেছে। এ মাসের শেষভাগের মধ্যে পদ্মা-মেঘনা পর্যন্ত ইলিশ পৌঁছে যাবে।'

বরিশাল জেলা মৎস্য অফিসের কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, 'আর ৪/৫ দিন পরে অমাবস্যা। তখন জোয়ারের পানির সঙ্গে সাগর ছেড়ে নদীতে ইলিশ প্রবেশের মোক্ষম সময়। অমাবস্যার পরে পদ্মা-মেঘনাসহ দক্ষিণের নদ-নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া না গেলে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ১ নভেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাটকা (৯ ইঞ্চির কম সাইজের ইলিশ) নিধনে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে পাচারের সময় প্রচুর জাটকা আটক হয়েছে। একই সময়ে জাটকার চেয়ে কিছুটা বড় সাইজের ইলিশও পাওয়া যায় পর্যাপ্ত পরিমাণ। আইনগত কারণে সেগুলো আটক করা যায়নি। এসব কারণে ইলিশ কমতে পারে। তবে অমাবস্যার পরেই জেলেরা পর্যাপ্ত ইলিশ পাবেন আশা করি।'

প্রায় অভিন্ন মত দেন অধিদপ্তরে বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক ড. মো. ওয়াহিদুজ্জামান। তিনি বলেন, 'গত বছরও আগস্টের শেষদিকে ইলিশ ধরা পড়া শুরু হয়। তা ছাড়া এ বছর পুরো জুলাই মাস বৈরী আবহাওয়ায় উত্তাল সাগরে যেতে পারেননি জেলেরা। তবে মোটের ওপর ইলিশের উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। এবার নদ-নদীতে প্রচুর জাটকা ছিল। জেলেরা চুরি করে যেখানে জাল ফেলেছে সেখানেই জাটকা পেয়েছে।'

ইলিশের এ সার্বিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চাঁদপুর ইলিশ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, 'পদ্মা-মেঘনায় যেভাবে নাব্য হ্রাস পাচ্ছে, তাতে গভীর জলের ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন করার আশঙ্কা রয়েছে।' তার দেওয়া তথ্যমতে, ইলিশের অভয়াশ্রম মেঘনার চাঁদপুরের হরিণঘাটা, আনন্দবাজার, ভোলার ইলিশা, মেহেন্দীগঞ্জের কালীগঞ্জ, পদ্মার মাওয়া ঘাটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নাব্যতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। পরিকল্পিত খনন না হওয়ায় অবস্থার অবনতি হচ্ছে ক্রমশ। ইলিশের অভয়াশ্রম এলাকায় গড়ে উঠছে পদ্মা সেতু, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, যা ইলিশের জন্য হুমকিস্বরূপ। দেশের উন্নয়নে এসব অবকাঠামো হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতিতে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার অবদান রাখা ইলিশ সম্পদ। ড. আনিছুর রহমানের মতেও, এ বছর ইলিশের বিষয়টি স্পষ্ট হতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।