মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

সুনামগঞ্জে বাসচাপায় নিহতের ১২ স্বজনের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তির বাসচাপায় প্রাণ গেছে। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরিবারের সদস্যদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। কারণ ঘাতক বাস পোড়ানোর মামলায় নিহতের পরিবারের ১২ সদস্যকে আসামি করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে বাস মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে। বাসচালক অবশ্য আদালত থেকে জামিন পেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দুর্ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা বাসটি পোড়ালেও বাসচাপায় নিহত রাহেল মিয়ার পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা করায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের বোগলারখাড়া গ্রামের মানুষ। তারা বলছেন, স্বজন হারানোর শোকে কাতর দরিদ্র পরিবারটিকে মামলা দিয়ে এমন হয়রানি যেন 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'।

জানা গেছে, গত ৩০ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান রাহেল। এতে উত্তেজিত এলাকাবাসী বাসটিতে আগুন দেয়। দু'দিন পর ১ সেপ্টেম্বর বাসচালকের বিরুদ্ধে নিহতের ভাই সাজমান আলী মামলা করেন। পরদিন ২ সেপ্টেম্বর সিলেট-সুনামগঞ্জ-ছাতক-দিরাই বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের পক্ষে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানায় মামলা করেন সমিতির ম্যানেজার রবিউল আলম। এতে নিহতের তিন ভাই, মামা, মামাতো ভাই ও দীর্ঘ ১১ বছর ধরে প্রবাসে থাকা একজনসহ ১২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন- মাসুদ আহমদ মামুন, ওবায়দুর রহমান কুবাদ, হানিফ উল্লাহ্‌, এবাদুর রহমান, আজিজুল হক, তোফায়েল আহমদ, নিহতের ভাই আলী আহমদ সুজন, রুবেল মিয়া, সাজমান মিয়া, জহির মিয়া, কামরুল ইসলাম টিপু ও তফাজ্জল হোসেন। গ্রেফতার এড়াতে রাহেলের স্বজনরা এখন গ্রামছাড়া।

নিহত রাহেলের তিন ভাই আলী আহমদ সুজন, রুবেল মিয়া, সাজমান মিয়া ও তাদের মামা ওবায়দুর রহমান কুবাদ রাহেলের মৃতদেহের সঙ্গে ওই দিন হাসপাতালে ছিলেন বলে দাবি করেছেন। এ ছাড়াও মামলার ছয় নম্বর আসামি তোফায়েল আহমদ দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ইতালি প্রবাসী। সড়ক দুর্ঘটনার নামে হত্যাকে অন্য খাতে প্রভাবিত করতে পরিকল্পিতভাবে এ মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করছে নিহতের পরিবার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছয় সন্তানের বাবা রাহেল নিহত হওয়ায় দিশেহারা পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্থানীয় এমপি অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।

শুক্রবার সরেজমিন বোগলারখাড়া গ্রাম ঘুরে জানা যায়, নিহত রাহেল পিডিবির দিরাই শাখার অস্থায়ী লাইনম্যান হিসেবে কাজ করতেন। কথা বলার সময় স্বামীর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন রাহেলের স্ত্রী শিবলি আক্তার। বাড়িজুড়ে পিনপতন নীরবতা। গোটা এলাকায় শোকের ছায়া। রাহেলের বৃদ্ধ মা সালেহা বেগম ঘর থেকে কেঁদে কেঁদে বের হয়ে বলেন, 'আমার সোনার টুকরা ছেলেরে খাইয়া তারার তৃষ্ণা মিঠছে না। অনে আমার আরও তিন ফুয়া, ভাই, ভাইর ফুয়াইন্তেরে আসামি কইরাবুলে মামলাও করছে। ই দেশো কিতা বিচার নাই? আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর আমরার মন্ত্রী সাবের কাছে (অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান) বিচার চাই।'

গ্রামবাসী রোকনুজ্জামান বলেন, 'রাহেলের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তা অমানবিক। এ সময় তারা লাশের সঙ্গে ছিল। আমরা তাদের গাড়িতে উঠিয়ে দিয়েছি।' মুক্তিযোদ্ধা মনির উদ্দিন বলেন, 'আমরা হতভম্ব! যাদের আসামি করা হয়েছে তারা কেউই তখন এলাকায় ছিল না। লাশের সঙ্গে ছিল।'

ছমির উদ্দিন ও খানাই গোস্বামী বলেন, 'এটা কোন ধরনের বিচার? রাহেল নিহত হওয়ার ঘটনা অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য এই মামলা হয়েছে। এই মামলা প্রত্যাহার করা উচিত।'

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'চালক একই ইউনিয়নের ডুংরিয়া শিবপুরের বাসিন্দা আলাউদ্দিন ইতিমধ্যে আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়েছেন। বাস মালিক সমিতির মামলার তদন্ত চলছে। যারা ঘটনায় সম্পৃক্ত নয় তাদের আসামি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।'