রোহিঙ্গাদের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন আরিফ উল্লাহ (৩৮)। উচ্চ শিক্ষিত এই রোহিঙ্গা নেতা ছিলেন উখিয়ার বালুখালী-২ ক্যাম্পের হেড মাঝি। গত ১৮ জুন রাতের আঁধারে তাকে গলা কেটে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তার পরিবারের সদস্যরা ভয়ে পালিয়ে গেছে টেকনাফের লেদায়।

উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের আরেক শীর্ষ মাঝি আবু ছিদ্দিক। ক্যাম্পের ভেতরেই তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃতভেবে বীরদর্পে চলে যায় সন্ত্রাসী বাহিনী। পরে তাকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় হাসপাতালে। আবু ছিদ্দিক বেঁচে গেলেও দুই হাত হারিয়ে পঙ্গু এখন।

বালুখালী ক্যাম্পের ডি ব্লকের নুর আলম (৪৫), মো. খালেক (২২) ও কুতুপালং ই ব্লকের মো. আনোয়ারকে (৩৩) ২ সেপ্টেম্বর ক্যাম্প থেকে ধরে নিয়ে যায় সন্ত্রাসী বাহিনী। পরের দিন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পারিয়াপাড়ার পাহাড়ি এলাকা থেকে গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এই তিন রোহিঙ্গাকে। উখিয়ার এমএসএফ ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে দুইজন সুস্থ হয়ে উঠলেও মারা গেছেন আনোয়ার। যে দুইজন বেঁচে আছেন আতঙ্কে তারাও ক্যাম্প ছেড়ে অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে গেছেন।

টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের ডি ব্লকের মাঝি ছিলেন রহিম উল্লাহ। গত ১৩ জুলাই ক্যাম্প-সংলগ্ন পাহাড় থেকে উদ্ধার করা হয় এই রোহিঙ্গার লাশ। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা ক্যাম্প থেকে অপহরণ করে তাকে গলা কেটে হত্যা করে। লাশ ফেলে দেয় পাহাড়ি ছড়ায়। এভাবে একের পর এক রোহিঙ্গা নেতা হত্যার ঘটনায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে উখিয়ায় বিশাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। কারা এসব নৃশংস অপরাধ ঘটাচ্ছে এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রায় সবাই জানে। ভয়ে মুখ খুলতে চায় না কেউ।

উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রোহিঙ্গারা জানান, তিনটি সন্ত্রাসী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ৩০ রোহিঙ্গা ক্যাম্প। এই সন্ত্রাসী গ্রুপের একটির নেতৃত্ব দিচ্ছে আবদুল হাকিম। অপর একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে মাস্টার আয়ুব। আরেকটি গ্রুপ পরিচালিত হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে। আল ইয়াকিনের সদস্য দাবি করে এই গ্রুপের লোকজন রাখাইনে অবস্থানরত আতা উল্লাহকে তাদের নেতা বলে প্রচার করে থাকে।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়ের তথ্য মতে, গত এক বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৬ জন খুন হয়েছেন। একই সময়ে এখানে নানা অপরাধে ২৪৭টি মামলা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ১২টি। এই পর্যন্ত ১২২ জন রোহিঙ্গা গ্রেফতার হলেও ক্যাম্পে কমেনি অপরাধের পরিমাণ। বরং বেড়েই চলেছে খুন খারাবি, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, মাদক চোরাচালানসহ নানা অপরাধ।

উখিয়া ও টেকনাফের মোট ৩০টি ক্যাম্পে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। সূত্র মতে, প্রতি ক্যাম্পে  একজন করে হেড মাঝির অধীনে ৪ শতাধিক মাঝির মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা চলছে। ত্রাণ তৎপরতাও চালানো হচ্ছে তাদের সহযোগিতায়। তবে বিশাল এই ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ মাঝি ও হেড মাঝিদের হাতে যেমন নেই, তেমনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও এখানে অসহায়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝিদের সন্ত্রাসী গ্রুপের নির্দেশ মতো চলতে হয়। নিয়মিতভাবে তাদের দিতে হয় চাঁদা। তাদের কথার হেরফের হলেই গলায় ছুরি চালানো হয়। কুপিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। সূত্র জানায়, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অনেক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ক্যাম্পে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক রোহিঙ্গা জানান, সন্ত্রাসী গ্রুপের চাহিদা মতো চাঁদার টাকা না দিলে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও তাদের কাছে অসহায়। শুক্রবার রাতে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের একটি গ্রুপ বালুখালী ক্যাম্পে চাঁদা আদায় করার সময় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২ সন্ত্রাসীকে আটক করে। কিন্তু পুলিশ তাদের নিয়ে আসার আগেই ওই সন্ত্রাসী বাহিনীর অপরাপর সদস্যরা মুহূর্তের মধ্যে পুলিশের ওপর হামলা করে হাতকড়াসহ আটক ২ সন্ত্রাসীকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। পুলিশ সদস্যরা কোনো প্রকারে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। একই রাতে টেকনাফের নোয়াপাড়া ক্যাম্পে ডাকাতি করতে এলে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে দুই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে ধরে পুলিশের হাতে দিয়েছে।

উখিয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আন্দোলনের নেতা মাহমুদুল হক চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গা শিবির নিয়ন্ত্রণ করছে কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপ। তাদের নির্দেশ উপেক্ষা করে রোহিঙ্গা শিবিরে কেউ কিছু করতে পারে না। এখানে পুলিশও অসহায়। তিনি বলেন, যতই দিন যাচ্ছে রোহিঙ্গারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা স্থানীয় লোকজনের ওপর চড়াও হচ্ছে। ক্যাম্পে অপরাধের পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয়দের এখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে।

উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় ২ লাখ মানুষ এখন চরম বিপদে। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে স্থানীয়রা এখন সংখ্যালঘু। রোহিঙ্গারা নানা অপরাধ করলেও তাদের পুলিশে দেওয়া যায় না। বিশাল ক্যাম্পে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, 'দিনের বেলায় যেমন তেমন, রাত নামলেই রোহিঙ্গা ক্যাম্প যেন এক আতঙ্কের জনপদ।'

উখিয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল খায়ের জানান, বিশাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানে অপরাধের পরিমাণ প্রতিদিন বাড়ছে। ওসি বলেন, 'রোহিঙ্গা নেতা আরিফসহ কয়েকটি হত্যা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে আমরা যে তথ্য পাচ্ছি, তা খুবই উদ্বেগজনক। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।' তিনি বলেন, পুলিশ এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়েই রাত-দিন ব্যস্ত। পুলিশ সদস্যদের কষ্টের সীমা নেই।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও উদ্বিগ্ন। বিশাল ক্যাম্পে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে কঠিন কাজ। তারপরও প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য ঝুঁকি নিয়ে এখানে কাজ করে যাচ্ছেন। এখানে ৭টি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৩টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। রয়েছে পুলিশের ১২টি বিশেষ মোবাইল টিম।

কক্সবাজারে শরণার্থী, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, ঝড়-বৃষ্টি এবং প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পলিথিনের একটি শেডের নিচে বিপুল সংখ্যক মানুষ এভাবে দীর্ঘদিন থাকতে পারে না। এই মুহূর্তে যেটা জরুরি তাদের নিরাপদে স্বদেশে ফেরত পাঠানো। মিয়ানমারের সদিচ্ছার অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।



মন্তব্য করুন