চট্টগ্রামে ৭০ শতাংশ ইটভাটায় নেই আধুনিক প্রযুক্তি

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৯

আবু সাঈম, চট্টগ্রাম

পরিবেশবান্ধব অনেক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে এখন ইট তৈরিতে। কিন্তু চট্টগ্রামে এখনও সেই সেকেলে পদ্ধতিতেই ইট পোড়ানো হয়। ব্যবহার করা হয় কাঠ। এতে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনি বৃক্ষনিধন হয় নির্বিচারে। চট্টগ্রামে এভাবে ইট তৈরি করা ৭০ শতাংশ ইটভাটায়। তাই নতুন প্রযুক্তিতে ইট তৈরিতে জোর দিচ্ছেন পরিবেশ অধিদপ্তরসহ পরিবেশবিদরা।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, 'ইটভাটায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে আছে চট্টগ্রাম। যারা করছে না তাদের নোটিশ দিচ্ছি ও জরিমানা করছি। তার পরও যারা আইন মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে ৪১৮টি ইটভাটার মধ্যে উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করছে মাত্র ১২৫টি। এর মধ্যে 'জিগজ্যাগ কিলন' ব্যবহার করছে ১২২টি, 'হাইব্রিড হফম্যান' প্রয়োগ করছে ১টি এবং 'অটোটানেল কিলন' ব্যবহার করছে ২টি। এসব ভাটার মধ্যে ১৪৬টি ভাটা মালিকের নেই পরিবেশ ছাড়পত্রও।

সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে রয়েছে দেড় হাজারের অধিক ইটভাটা রয়েছে।

সরকার ২০১২ সালে পরিবেশ দূষণ রোধে জিগজ্যাগ পদ্ধতি ব্যবহারের নির্দেশ দেন ইটভাটা প্রস্তুতকারক এবং মালিকদের। রূপান্তরের জন্য প্রথমে কিছুদিন সময় দেওয়া হয় তাদের। এরপর এক লাখ টাকা জরিমানা করে নতুন পদ্ধতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। তার পরও কাঙ্ক্ষিত সাড়া না মেলায় ২০১৪ সালের জুনে জরিমানা নির্ধারণ করা হয় দুই লাখ টাকা।

'ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩'-তে বলা হয়েছে- ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি যেমন 'জিগজ্যাগ', 'হাইব্রিড হফম্যান', কিলন' এবং 'ভার্টিক্যাল শফট ব্রিক কিলন' স্থাপন করতে হবে। আবাসিক, সংরক্ষিত, বাণিজ্যিক, কৃষি, বন, অভয়াশ্রম, জলাভূমি এবং পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ইটভাটা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা, নিষিদ্ধ এলাকাগুলোতে ইটভাটা স্থাপন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং প্রাকৃতিক ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী

অপরাধীদের বিভিন্ন মাত্রায় শাস্তি প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। আবাসিক, সংরক্ষিত অথবা বাণিজ্যিক এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। ইট উৎপাদন করতে কেউ কৃষি জমি, পাহাড় বা গিরিপথ থেকে মাটি সংগ্রহ করে তা কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।

জানা যায়, জিগজ্যাগ হচ্ছে ইট পোড়ানোর একটি আধুনিক পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ২৫০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৮০ ফুট প্রস্থের চুল্লি বানাতে খরচ পড়ে প্রায় সাত কোটি টাকা। আঁকাবাকা এ চুল্লিতে থাকে আবার ৫৫ ফুট উচ্চতার একটি চিমনি। যাতে ধোঁয়াগুলো ফিল্টারিং করে পরিবেশে যায়। এ চুল্লিতে কাঁচা ইটগুলোর মধ্যে ৪৪ থেকে ৫২টি পর্যন্ত আলাদা আলাদা চেম্বার থাকে, যাতে আঁকাবাকাভাবে পানির ওপর দিয়ে ধোঁয়া বের করা হয়। যাতে বিষাক্ত বা দূষিত বস্তুগুলো পরিবেশে না ছড়িয়ে পানির মধ্যে পড়ে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর আবার পানিগুলো পরিবর্তন করে স্লাজগুলো বের করা দেওয়া হয়। আঁকাবাকা চুলা দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার ফলে কমে দূষণের মাত্রাও। এতে কয়লার মাধ্যমে ইট পোড়ানো হয়। এ ছাড়াও রয়েছে অটোব্রিকস, হাইব্রিড হফম্যানের মতো উন্নত প্রযুক্তি। হাইব্রিড হফম্যান প্রযুক্তিতে ব্যয় হয় প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এখানে ইট পোড়াতে দরকার হয় গ্যাস। গ্যাস লাগে অটোব্রিকসেও।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মো. ফরিদুল আলম জানান, সরকার দেশের কয়লা সহজলভ্য করলে এবং নতুন পদ্ধতি গ্রহণে প্রণোদনা দিলে সবাই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে কয়লার মাধ্যমে ইট পোড়ানো হয় বলে পরিবেশের তেমন ক্ষতি হয় না।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হক বলেন, 'সনাতন পদ্ধতিতে ইট পোড়ানোর ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এর পাশাপাশি বনের কাঠ ও জমির উর্বরতাও ধ্বংস হচ্ছে। বিভাগের অন্যান্য জেলায় ইটভাটায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের হার বেশি হলেও চট্টগ্রামে প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে এ হার বাড়ানো যাচ্ছে না। প্রশাসন যদি কঠোর হয় তাহলে একটি ভাটাও আধুনিক পদ্ধতির বাইরে উৎপাদন করতে পারত না।'