বিনা পয়সার ভ্যাকসিন 'অর্ধেক দামে'

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৯

বকুল আহমেদ

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের গেট দিয়ে এক যুবক বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাকে থামিয়ে জানতে চাইলাম, তিনি রোগী কি-না। জানালেন, কুকুর পায়ে কামড় দিয়েছে। তাই জলাতঙ্ক রোগের ভয়ে তিনি মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে ছুটে এসেছিলেন মহাখালীর এই বিশেষায়িত হাসপাতালে। তার ধারণা ছিল, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাবেন। কিন্তু হাসপাতালে আসার পর সে ধারণা পাল্টে যায়। র‌্যাবিক্স-আইজি নামে সরকারি একটি ভ্যাকসিন তাকে হাসপাতাল থেকেই এক হাজার পাঁচশ' টাকায় কিনতে হয়েছে, যেটা বিনামূল্যে সরবরাহ করার কথা। তিন হাজার ইউনিটের এই ভ্যাকসিন বাইরে বিক্রি হয় তিন হাজার টাকায়। বিনামূল্যের ভ্যাকসিন হাসপাতাল থেকে কিনেও তার এক হাজার পাঁচশ' টাকা বাঁচল বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন সাদ্দাম হোসেন নামের এই যুবক। তবে প্রয়োজনীয় অন্য টিকা বিনামূল্যেই পেয়েছেন তিনি। গত সোমবার দুপুরে হাসপাতাল চত্বরে এসব কথা হয় তার সঙ্গে।

শুধু সাদ্দাম নন, ঢাকা ও এর আশপাশ থেকে আসা রোগীদের অনেককেই র‌্যাবিক্স-আইজি ভ্যাকসিনটি কিনে এনে শরীরে পুশ করতে হয়। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ভোলানাথ বসাক বলেন, র‌্যাবিক্স-আইজি ভ্যাকসিন সব রোগীর প্রয়োজন হয় না। কামড়ে বেশি ক্ষত হলে সেই স্থানে এই ভ্যাকসিন পুশ করতে হয়। এই ভ্যাকসিন সরবরাহের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিদিন ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার ইউনিট সরবরাহের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। তাই অতিদরিদ্র রোগীকে প্রয়োজন অনুসারে এটা দেওয়া হয়। তবে হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যের এই ভ্যাকসিনের জন্য টাকা নেওয়া হয় না বলে দাবি করেন তিনি।

সিনিয়র স্টাফ নার্স মহসিন মিয়া বলেন, র‌্যাবিক্স-আইজি ভ্যাকসিন মানুষের শরীরের ওজন অনুযায়ী দিতে হয়। সরকার প্রতিদিন যা বরাদ্দ দেয়, তাতে ১০-১৫ জন রোগীকে দেওয়া যায়। অন্যদের বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হয়।

তবে হাসপাতালের পক্ষ থেকে দরিদ্র রোগীদের র‌্যাবিক্স-আইজি ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা বলা হলেও সরেজমিনে দেখা গেছে, তারা পাচ্ছে না এই ভ্যাকসিন। গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় হাসপাতাল চত্বরে সরেজমিনে দেখা যায়, গৃহকর্মী সামসুন্নাহার তার ১০ বছরের ছেলে রিয়াদকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ফার্মেসির দিকে ছুটছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে হাসপাতালের পাশেই মা ফার্মেসি থেকে র‌্যাবিক্স-আইজি কিনে তিনি ফিরলেন হাসপাতালে। সামসুন্নাহার বলেন, 'আমি অন্যের বাড়ি কাজ করি। আমার স্বামী বাড়ির দারোয়ানের চাকরি করে। ছেলেকে ৫ তারিখে (৫ জানুয়ারি) কুকুরে কামড় দিয়েছে। ওই দিন হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম। সেদিন দুই হাতে ইনজেকশন দিয়েছে। আর এই ওষুধটা (ভ্যাকসিনের পাকেট দেখিয়ে) কিনতে বলেছিল। সেদিন টাকা ছিল না। তাই আজ এক হাজার ১৭০ টাকা দিয়ে কিনে আনলাম। এই টাকা জোগাড় করতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।' সামসুন্নাহার জানান, খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়ায় তারা থাকেন।

তার স্বামী তিলপাপাড়ার একটি বাড়ির দারোয়ান।

মুন্সীগঞ্জের দিনমজুর আলামিন গত মঙ্গলবার তার সাড়ে তিন বছরের ছেলে আলীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তিনি জানান, মাসখানেক আগে তার ছেলেকে কুকুরে কামড় দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে গত মঙ্গলবার টিকা দেওয়া হয় আলীর দু'হাতে। ১১ জানুয়ারি আবার আসতে বলেছেন চিকিৎসক। আলামিন বলেন, '১১ তারিখে এই ইনজেকশনটা (র‌্যাবিক্স-আইজি ভ্যাকসিন) ডাক্তার কিনে আনতে বলেছেন।' এক ঘণ্টায় এমন অন্তত ১০ জন রোগী পাওয়া যায়, যাদের র‌্যাবিক্স-আইজি ভ্যাকসিন কিনে আনতে বলা হয়েছে।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, রাজধানী ও এর আশপাশ এলাকা থেকে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন নতুন রোগী সেবা নিতে আসেন দেড় শতাধিক। এ ছাড়া বিড়াল, বেজি, বানরসহ অন্যান্য পশুর আঁচড় বা কামড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন নতুন রোগীর সংখ্যাও শতাধিক। পাশাপাশি পুরাতন রোগী তো আছেই। মঙ্গলবার কুকুরে কামড়ে আক্রান্ত ১৬৮ জন চিকিৎসাসেবা নেন এই হাসপাতালে। এ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ৬৬ জন। একজন নার্স জানান, মঙ্গলবার চিকিৎসাসেবা নেওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কোনো কোনো দিন সংখ্যা আরও বাড়ে।

গত বছর ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে কুকুর, বিড়াল, বানর, বেজি, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ৭০ হাজার ১৮১ জন। এর মধ্যে শুধু কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ৫১ হাজার ৩৭১ জন।

জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নয় বছরে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৭০৩ জন। এর মধ্যে গত বছরে মারা গেছেন ৩৬ জন। এর আগে ২০১৭ সালে ৫৬ জন, ২০১৬ সালে ৫২, ২০১৫ সালে ৬৬, ২০১৪ সালে ১০৪, ২০১৩ সালে ৯১, ২০১২ সালে ৮৫, ২০১১ সালে ১০৯ ও ২০১০ সালে ১০৪ জন জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এই তথ্যানুযায়ী ২০১০ সালে মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে ২০১৮ সালে কমেছে বা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে।

সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, সাগুতা ইসলাম নামের এক তরুণী কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে এসেছেন হাসপাতালে। টিকিট কেটে ৪ নম্বর কক্ষে যাওয়ার পর চিকিৎসক তার চিকিৎসাপত্র দেন। র‌্যাবিক্স-আইজি ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনতে বলা হয়। সাগুতার সঙ্গে থাকা এক তরুণ চিকিৎসাপত্র হাতে নিয়ে ছুটে যান হাসপাতাল চত্বর লাগোয়া একটি ফার্মেসিতে। তরুণের সঙ্গে এই প্রতিবেদকও যান ফার্মেসিতে। দোকানি ভ্যাকসিনের দাম চাইলেন তিন হাজার টাকা। এত টাকা মূল্য শুনে তরুণ ফিরে আসেন। সমকালকে বলেন, 'আজকে এই ভ্যাকসিন দেব না। আত্মীয় ডাক্তার আছে, তাদের কাছে আগে জেনে নিই।' তবে সাগুতাকে শেষ পর্যন্ত ভ্যাকসিন বিনামূল্যেই দেওয়া হয়েছে।