মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আসকের প্রতিবেদন

বিচারবহির্ভূত হত্যা তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ২০১৮ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সংগঠনটি বলেছে, মানবাধিকারের প্রধান দুটি সূচকের একটি- অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রে বিগত বছরগুলোর অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকলেও আরেকটি সূচক-নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। অবশ্য গত বছর মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক অবস্থা- এ তিনটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এ ছাড়া নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে সরকারের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও লক্ষ্য করা গেছে। তবে সার্বিক পর্যবেক্ষণে বিগত বছরগুলোর মতো ২০১৮ সালেও মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক। কারণ, বিদায়ী বছরে ক্রসফায়ার-বন্দুকযুদ্ধসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ৪৬৬ জন নিহত হয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আসকের ২০১৮ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন আসকের উপপরিচালক নীনা গোস্বামী ও জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির।

পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৮ সালজুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা, বিশেষ করে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুলিবিনিময় ও গুম-গুপ্তহত্যার ঘটনা অব্যাহত ছিল। গত বছর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধে দেশজুড়ে ২৯২ জন নিহত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, গুলিবিনিময়, নিরাপত্তা হেফাজতে মোট ৪৬৬ জন নিহত হয়েছে। এর সংখ্যা ২০১৭ সালে ছিল ১৬২।

গত বছর আইন রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে গুম হন ৩৪ জন। এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে ১৯ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের অধিকাংশই বিভিন্ন মামলায় আটক আছেন। এছাড়া বেআইনি আটক, গণগ্রেফতারসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৭০টি সহিংসতার ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৯ জন, বিএনপির ৪ জন, একজন আনসার সদস্য, ১০ জন সাধারণ মানুষ রয়েছেন।

ধর্ষণের বিষয়ে সংগঠনটি বলেছে, ২০১৮ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন। ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার ৬৩ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাতজন। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭২৪।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাংচুরের অনেক ঘটনাসহ আহমদিয়া সম্প্রদায়কে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী কর্তৃক হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ের ৯৭টি প্রতিমা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং ২৯টি বাড়িঘরে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নিহত এবং ৪৬ জন আহত হয়েছেন।

২০১৭-এর তুলনায় গত বছর কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহতের সংখ্যা বেড়েছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে মোট ৪৮৪টি দুর্ঘটনায় ৫৯২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। ২০১৭ সালে ৩২৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ৪৩৭ জন শ্রমিক। এ ছাড়াও আসকের পক্ষ থেকে সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতন, শিশু নির্যাতন ও হত্যা, শ্রমিক অধিকার, আদিবাসীদের অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকারসহ কয়েকটি বিষয়েও তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

আসকের নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজা বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও তাদের নিজস্ব সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে মানবাধিকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা গত বছর অনেক বেশি হয়েছে। নারী ও শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত নির্যাতনও অনেক বেড়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এগুলো কমিশন গঠন করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা উচিত। বিচার ব্যবস্থার বাইরে যেভাবে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে তা দুঃখজনক।