বিপর্যয় রোধে আসছে নতুন 'গ্রিড কোড'

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৯

হাসনাইন ইমতিয়াজ

বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের ঘটনা বাংলাদেশসহ বিশ্বে নতুন নয়। ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর দেশজুড়ে বিদ্যুতের ভয়াবহ ব্ল্যাক আউটের ঘটনা ঘটে। এর পরও সঞ্চালন ব্যবস্থাপনায় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। ফলে জাতীয় গ্রিড এখনও নিরাপদ নয়। এর মধ্যেই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। চলতি বছরই কয়লাচালিত একাধিক বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসার কথা। কাজ চলছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের। নির্মিত হচ্ছে গ্রিডভিত্তিক বড় ধরনের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। তেলচালিত ও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রিডে যুক্ত হলে সঞ্চালন ব্যবস্থা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। জাতীয় গ্রিডের এই বিপর্যয় রোধে সঞ্চালন ব্যবস্থার জন্য বিশেষ বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গ্রিড ফ্রিকোয়েন্সি বিচ্যুতির গ্রহণযোগ্য সীমার পরিমাণ কমিয়ে নতুন 'গ্রিড কোড' প্রণীত হচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিডের জন্য বিদ্যুৎ সঞ্চালনের আদর্শ ফ্রিকোয়েন্সি ধরা হয় ৫০ হার্টজ। এখন এর চেয়ে এক হার্টজ কম বা বেশি হলেও সে অবস্থাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়। নতুন গ্রিড কোড অনুসারে এই কম-বেশির সীমারেখা শূন্য দশমিক ৫ হার্টজে নামিয়ে আনা হচ্ছে। অর্থাৎ গ্রিডে ফ্রিকোয়েন্সির তারতম্য ৪৯.৫ হার্টজ থেকে ৫০.৫ হার্টজ মধ্যে রাখতে হবে, যা এখন ৪৯ হার্টজ থেকে ৫১ হার্টজ।

সংিশ্নষ্টদের মতে গ্রিডে ফ্রিকোয়েন্সির অস্বাভাবিক ওঠানামায় সঞ্চালন ব্যবস্থা অনিরাপদ হয়ে ওঠে। প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গড়ে না তুললে দেশজুড়েই বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। নির্ধারিত মানের চেয়ে ফ্রিকোয়েন্সি অতিরিক্ত কমা-বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট।

বিদ্যুৎ খাতের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, লোড ব্যবস্থাপনা ঠিক মতো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ওঠা-নামা করে। চাহিদার সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থার সঠিক সমন্বয় না থাকায় এমনটা ঘটে। চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হলে সঞ্চালন লাইনের ফ্রিকোয়েন্সি ৫০ হার্টজের বেশি ওপরে চলে যায়। আবার চাহিদার চেয়ে কম উৎপাদন হলে ফ্রিকোয়েন্সি ৪৯ হার্টজের নিচে নেমে যায়। এ ছাড়া সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় ভোল্টেজের পার্থক্যের

কারণেও ফ্রিকোয়েন্সি কমে-বাড়ে। তারা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ফ্রি গভর্নিং মুড অব অপারেশনে (এফজিএমও) পরিচালিত হলে সঞ্চালন লাইনে ফ্রিকোয়েন্সির বিচ্যুতি কম হয়। অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন উৎপাদন সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুইচ থাকে। এফজিএমও পদ্ধতি হলো একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যা নির্ধারণ করে দেয় চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্র কতটুকু উৎপাদন করবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদুৎকেন্দ্র, বিশেষ করে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো এই পদ্ধতিতে চালানো সম্ভব হয় না। ফলে ফ্রিকোয়েন্সির আদর্শ মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার গ্রাহক পর্যায়ের কর্মকাণ্ডেও ফ্রিকোয়েন্সির বিচ্যুতি ঘটে। হঠাৎ করে অতিরিক্ত চাহিদার সৃষ্টি হওয়ার পর সে অনুসারে বিদ্যুৎ না পেলে সঞ্চালন লাইনের ফ্রিকোয়েন্সি নিচে নেমে যায়।

এ বিষয়ে বিইআরসির সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, তেল-গ্যাস ছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামীতে গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ছে। সব মিলিয়ে সঞ্চালন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য গ্রিড কোড প্রণয়ন করা হচ্ছে। শিগগিরই বিধিমালা প্রণীত হবে। তিনি বলেন, এখানে বলা থাকবে ফ্রিকোয়েন্সি কমলে-বাড়লে কোন সংস্থা কী ভূমিকা রাখবে, কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, সঞ্চালন লাইনে কী প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ফ্রিকোয়েন্সির আদর্শ মান ধরে রাখা যাবে তা বিধিমালায় উল্লেখ থাকবে। বিতরণ ও সঞ্চালন সংস্থাগুলো এই নির্দেশনা অনুসারে কাজ করছে কিনা তা তদারকির জন্য একটি পৃথক কমিটি থাকবে।

জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম আল বেরুনী বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সময় এর সঞ্চালন লাইনে বিশেষ যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। রাশিয়া এ কাজে সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া কোন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র এফজিএমও পদ্ধতিতে চালানো যায় সে বিষয়ে পাওয়ার সেলের মাধ্যমে একটি জরিপ চালানো হচ্ছে। জাতীয় লোড ডেসপাস সেন্টারকে স্বয়ংক্রিয় ও আধুনিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ধীরে ধীরে পুরো সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা স্মার্ট গ্রিডের আওতায় আনা হবে।