রূপসাখেকোদের রুখবে কে

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

হ হাসান হিমালয়, খুলনা

নদী দখলের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদের মধ্যেও খুলনায় চলছে রূপসা নদী দখলের উৎসব। নগরীর কাস্টমঘাট এলাকা ও জেলখানা ঘাট থেকে বাজার এলাকায় নদীর পাড়ে ব্যবসা করছেন প্রভাবশালীরা। রূপসা নদী দখলমুক্ত করতে ২০১৪ সালে এর পাড়ের সব খাসজমি ইজারা বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন। দখলদারদের হাত থেকে নদীকে মুক্ত করতে একাধিকবার তালিকাও তৈরি করা হয়। অনুসন্ধানে ৬১ ব্যক্তির বিরুদ্ধে নদীর ছয় একর এলাকা দখল করে রাখার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এখনও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি সরেজমিন নগরীর কাস্টমঘাট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীতীরের বিশাল এলাকা দখল করে কেউ ইটের গোলা, কেউ বালু ও পাথরের ব্যবসা করছেন। প্রায় সবাই নদীর ভেতরের জায়গা দখল করে ভরাট করে ফেলেছেন। সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে পাকা বাড়ি। তৈরি করা হয়েছে বিশাল ডকইয়ার্ড। সেখানে নির্বিঘ্নে চলছে আগুন দিয়ে লোহা কাটা ও জোড়া লাগানোর কাজ।

রূপসা ও ভৈরব নদের পাড়ে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত ও দখলের বিষয়টি দেখাশোনা করে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ।

তবে বর্তমান দখলদার ও ইজারা গ্রহীতাদের সম্পর্কে সেখানে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। দখল উচ্ছেদে ২০১৫ সালে করা তালিকা সম্পর্কেও কর্মকর্তারা কেউ জানাতে পারেননি।

নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, রূপসা নদীর পাড়ে সরকারি খাসজমিতে ব্যবসা চলছে কয়েক যুগ ধরে। আশির দশকে নদীর পাড়ে ব্যবসার জন্য তাদের মধ্যে খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। প্রত্যেক ব্যবসায়ী কম-বেশি ৪০ থেকে ৬০ ফুট প্রস্থ এবং ৮০ ফুট লম্বা জমি বরাদ্দ পান। কিন্তু বর্তমানে সবাই নদীর ১৫০ থেকে ২২০ ফুট পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। প্রায় সবাই নদী ভরাট করে তাদের সীমানা বাড়িয়েছেন। জেলা প্রশাসনের তৈরি করা পুরনো তালিকায় দেখা গেছে, নদী ভরাট করে ব্যবসা করছেন ৬১ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা সরকারি জমিতে ডকইয়ার্ড, স' মিল, ইট-বালু ও কাঠের গোলা, ভ্রাম্যমাণ হোটেল, গোলপাতার ঘর, কয়লা, সিমেন্ট এবং করাত কলের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দখলদারদের হাত থেকে রূপসা নদী রক্ষার জন্য কাস্টমঘাট এলাকায় একটি সরকারি নৌযান মেরামত কারখানা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য তিন একর খাস জমি নামমাত্র মূল্যে যানবাহন অধিদপ্তরকে বরাদ্দও দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল ওই জমি হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু তার পরও ব্যবসায়ীরা জমির দখল ছাড়েননি। ফলে সরকারি এই কারখানাটির নির্মাণকাজও শুরু হয়নি।

স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে নদীর পাড়ের জমিতে যারা ব্যবসা করছেন তাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক দলের নেতা। এ ছাড়া রয়েছেন সাবেক ও বর্তমান কাউন্সিলররা। এ জন্য নদী দখল নিয়ে সবাই নীরব।

এ ব্যাপারে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, সম্প্রতি খুলনার ময়ূর নদী ও সংযুক্ত ২২টি খালে অবৈধ দখল চিহ্নিত করতে কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু রূপসা ও ভৈরব নদী দখল নিয়ে কারও তেমন মাথাব্যথা নেই। যারা নদী দখলের বিরুদ্ধে সোচ্চার তাদেরই দেখা যাচ্ছে রূপসার দখলদারদের পাশে দাঁড়াতে। বিষয়টি দুঃখজনক। অবিলম্বে ভৈরব ও রূপসা পাড়ের দখলদারদের উচ্ছেদ করে নতুন করে বাঁধ ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

খুলনায় নদী ও খালের অবৈধ দখল পরিমাপ করতে গঠিত কারিগরি কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সরোয়ার আহমেদ সালেহীন সমকালকে বলেন, প্রথমে ময়ূর নদী পরিমাপ করা হবে। ধীরে ধীরে অন্যসব নদীর দখলও চিহ্নিত করা হবে। খুলনার জেলা প্রশাসক মো. হেলাল হোসেন বলেন, এবার কোনো প্রভাবশালী ছাড় পাবেন না। সবখানে নদী পরিমাপ করা হবে। এতে একটু সময় লাগবে। দখলদাররা যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, নদী দখলকারীরা কেউ ছাড় পাবেন না।