সাগরপথে মালয়েশিয়া যাত্রা ঝিনাইদহের ১৯ যুবক ৬ বছর নিখোঁজ

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি

দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশে রওনা দেওয়া ঝিনাইদহের চার ইউনিয়নের ১৯ যুবক ৬ বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছে। বুকে বোবাকান্না নিয়ে এই ১৯ যুবকের পরিবারের সদস্যরা আজও তাদের ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নিখোঁজ যুবকরা হলো সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের আব্দুলল্গার ছেলে আব্দুল হামিদ, মৃত তোফাজ্জেলের ছেলে লাবলু রহমান জিতু ও আবুল কাসেমের ছেলে আরাফাত। একই ইউনিয়নের গাড়ামারা গ্রামের গোলাম রসূলের ছেলে রিপন, গোলাম মোস্তফা দুলালের ছেলে ফরিদ হোসেন, ইদ্রিস আলির ছেলে আবু বকর, শহর আলির ছেলে নাজমুল হক, নাছির উদ্দিনের ছেলে লালচাঁদ, বসির উদ্দিনের ছেলে মাসুদ রানা মচু, শাহী উদ্দিনের ছেলে আলমগীর ও লুৎফর রহমানের ছেলে অলিয়ার রহমান, ফুরসন্দি ইউনিয়নের মিয়াকুন্ডু গ্রামের সাহেব আলী মণ্ডলের ছেলে ইউনুছ আলী, জলিল জোয়ার্দারের ছেলে বাচ্চু জোয়ার্দার, ময়েন উদ্দিন জোয়ার্দারের ছেলে বিপুল জোয়ার্দার ও আতিয়ার রহমান বিশ্বাসের ছেলে ওলিয়ার রহমান, ঘোড়শাল ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামের বিশারত মণ্ডলের দুই ছেলে তারিক মণ্ডল ও উলফাত মণ্ডল ও দীপু বিশ্বাসের ছেলে শহিদুল ইসলাম ও মধুহাটী ইউনিয়নের মহামায়া গ্রামের জালাল উদ্দীন।

নিখোঁজ যুবকরা কোথায় আছে পরিবারের কেউ জানে না। দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ট্রলারে চেপে তারা ফোনে শুধু এটুকুই বলেছে- 'আমি মালায়েশিয়া যাচ্ছি, অমুক দালালের কাছে টাকা পাঠাও'। এমন নিখোঁজ এক যুবক ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হালিধানি ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের আব্দুল হামিদ। তার মা হাজেরা বেগম সন্তানের জন্য ৬ বছর পথ চেয়ে বসে আছে। মসজিদ ও মাজারে বহু মানত করেছে। রোজা ও নফল নামাজ পড়েছে। কিন্তু তার বুকের ধন হামিদ আজও ফিরে আসেনি। বুক চাপড়ে আহাজারি করতে করতে হাজেরা বেগম বলেন, আকার (চুলা) আগুন নিভে যায়, কিন্তু বুকের আগুন নেভে না। হামিদের স্ত্রী লিপি খাতুন জানান, আমার কোলের মেয়ে জামিলার বয়স যখন এক বছর তখন স্বামী এক বিকেলে হলিধানি বাজারে যাওয়ার নাম করে বের হয়, আর ফিরে আসেনি। ১৪/১৫ দিন পর একটি অচেনা নম্বর থেকে মোবাইলের মাধ্যমে জানায়, আমি মালয়েশিয়া চলে যাচ্ছি, জাহাজে উঠেছি পরে কথা হবে। মালায়েশিয়া গেলে টাকা দিতে হবে। এই বলে মোবাইল কেটে দেয়। সে বেঁচে আছে না মরে গেছে সেটাও জানি না। আমার ছোট মেয়ে জামিলার বয়স এখন ৬ বছর। হামিদের ৩ মেয়ে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। একই গ্রামের ঘটনার শিকার দুই কন্যার জনক নিখোঁজ লাবলু। তার বাবা ছেলের শোকে দুই বছর

আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। পাশের বাড়ির নিখোঁজ আরাফাতের স্ত্রী হালিমা খাতুন জানান, তারও ৩ মেয়ে বাবার ছবি বুকে আঁকড়ে ধরে কান্নাকাটি করে।

সাগরপথে মালয়েশিয়া গিয়ে ফিরে আসা রামচন্দ্রপুর গ্রামের আব্দুল মতিন নির্মম অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ট্রলারে যাওয়ার সময় দালালরা ঠিকমতো খাবার দেয় না। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে জীবিত সাগরে ফেলে দেয়। আবার কাউকে কাউকে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে মুমূর্ষু অবস্থায় পুঁতে রাখে। এটা তিনি নিজে চোখে দেখেছেন। ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে আরও অনেক যুবক মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় নিখোঁজ থাকতে পারেন এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এসব পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাড়ামারা গ্রামের লুৎফর রহমানের ছেলে আতিয়ার দালাল এদের অবৈধ পথে নিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। ক্ষতিগ্রস্তরা আতিয়ারের নামে মামলা করলেও সে জামিনে মুক্ত হয়ে মালয়েশিয়ায় চলে গেছে। এই ৮ জনের মধ্যে দালাল আতিয়ারের ভাই ওলিয়ারও নিখোঁজ রয়েছে। এ ছাড়া ঘোড়শাল ও ফুরসন্দি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে নিখোঁজ ৭ যুবকের কাছ থেকে তেতুলবাড়িয়া গ্রামের শামছুদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে সবের আলী দালাল ও ঝিনাইদহ শহরের পবোহাটি গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে আফাঙ্গির দালাল মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ সব দালাল থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন জেলে নিখোঁজ যুবকদের আটক থাকার মিথ্যা তথ্য দিয়ে কয়েক দফা টাকা হাতিয়ে নেয় ওই পরিবারগুলোর কাছ থেকে।

ঝিনাইদহ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক সবিতা রানী জানান, যারা বৈধভাবে বিদেশে যান কেবল তাদের তথ্য থাকে। অবৈধভাবে কেউ গিয়ে ক্ষতি বা মৃত্যুর শিকার হলে তাদের আইনগত সহায়তা দেওয়া যায় না। কারণ তাদের কোনো তথ্য থাকে না।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি মিজানুর রহমান খান বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তথ্যপ্রমাণ দিয়ে অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।