৮ বছরেও শেষ হয়নি সাক্ষ্য গ্রহণ

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯     আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

ইন্দ্রজিৎ সরকার

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কামরুন নাহার নাদিয়ার লাশ গুম করার জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজছিলেন তার স্বামী সিকদার শফিকুর রহমান রেজা। স্ত্রীর মৃতদেহ গাড়ির পেছনের আসনে বসে থাকার ভঙিতে রেখে বিভিন্ন সড়কে ঘুরছিলেন তিনি। তার ধারণা ছিল, কেউ দেখলে নাদিয়াকে মৃত বলে বুঝতে পারবে না। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। তার গাড়িচালক রবিউল ইসলাম গাড়িসহ ঢুকে পড়েন শাহবাগ থানা চত্বরে। ধরা পড়েন রেজা।

চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনার আট বছর হতে চলেছে। তবে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণই শেষ হয়নি এখনও। বাদীপক্ষের অভিযোগ, নানারকম কারসাজি ও টালবাহানা করে সময়ক্ষেপণ করছে আসামিপক্ষ। এমনকি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত আদালতের মালখানা থেকে নিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। ফলে মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্দুল মান্নান খান বলেন, 'প্রথম কয়েক বছর মামলাটি ঠিকঠাক চললেও পরে নানা কারণে মন্থর হয়ে পড়ে গতি। আসামিপক্ষের আদালত পরিবর্তন, পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণের আবেদন, দীর্ঘ বিরতিতে শুনানির তারিখ ধার্য হওয়া ও আদালতের মালখানা থেকে কৌশলে আলামত নিয়ে নষ্ট করার মতো কিছু ঘটনা ঘটেছে। ফলে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।'

২০১১ সালের ২৩ এপ্রিল হাজারীবাগের বাসায় নাদিয়াকে হত্যার পরদিন স্ত্রীর লাশসহ ধরা পড়েন রেজা। তখন সমকালে 'লাশ বসে আছে গাড়িতে!' শিরোনামে ছবিসহ খবর প্রকাশ হলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। হাজারীবাগ থানায় দায়ের মামলাটি পরে তদন্ত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারা রেজা ও তার মা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। দু'জনই জামিনে রয়েছেন এখন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী জানান, ২০১৭ সালে আদালত পরিবর্তনের আবেদন করেন হত্যায় অভিযুক্ত সিকদার শফিকুর রহমান রেজা। তার আবেদনের ভিত্তিতে মামলাটি স্থানান্তর করা হয় চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে। এর আগেই ১৪-১৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। তবে কয়েকজনের সাক্ষ্য আবারও নেওয়ার আবেদন করে আসামিপক্ষ। ফলে নতুন করে সাক্ষ্য গ্রহণে আরও সময় দরকার পড়বে। ঘটনার

এতদিন পর সব সাক্ষীকে হাজির করাও বেশ কঠিন।

এদিকে অভিযুক্ত রেজা মামলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আলামত আদালতের মালখানা থেকে নিয়ে আর ফেরত দেননি বলে অভিযোগ বাদীর। হত্যাকাণ্ডের পর তার প্রাইভেটকার, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোন, হত্যায় ব্যবহূত কাঠের বাতি, কাঠের টুকরা ও নাদিয়ার সালোয়ার-কামিজ জব্দ করে পুলিশ। মামলা তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় রেজা এসব আলামত পাওয়ার জন্য আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। ২০১২ সালের ২৫ জুন সেগুলো মালখানা থেকে বুঝে নেন রেজা। সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে আদালত কাঠের বাতি ও টুকরা উপস্থাপনের নির্দেশ দিলেও তা দেয়নি আসামিপক্ষ। ফলে আলামত গায়েবের অভিযোগে রেজার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠান আদালত।

মামলার বাদী ও নিহতের ভাই শরীফ আহমেদ শাহরিয়ার সিরাজী সুজন বলেন, 'পরিকল্পিতভাবে মামলার আলামত নষ্ট করেছেন রেজা। নানা কৌশলে তিনি আদালতের সময় নষ্ট করে চলেছেন। এভাবে তিনি মামলা থেকে বাঁচার চেষ্টা

করছেন। নিজেকে তিনি যুবলীগ কর্মী এবং প্রভাবশালী এক আওয়ামী লীগ নেতার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দেন। প্রভাব খাটিয়ে, হুমকি দিয়ে ও অর্থের বিনিময়ে তিনি মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।'

জানতে চাইলে আসামিপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম সজীব বলেন, 'হত্যা মামলার বিচার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে, এমন কোনো বিধি বা নির্দেশনা নেই। বরং বলা হয়েছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে। কেউ চাইলে আদালত পরিবর্তনের আবেদন করতেই পারেন। তাছাড়া আদালত সব পক্ষের বক্তব্য শুনে তারপর কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেন। এখানে আসামিপক্ষের সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই। বরং বাদীপক্ষই সাক্ষীদের ঠিকমতো হাজির করতে না পারায় সময় নষ্ট হচ্ছে। আর মামলার আলামত কাঠের বাতি ও টুকরা তারা আদালতের কাছে চাননি এবং মালখানা থেকেও নেননি।'