বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চার দশক পূর্তি উদযাপন

চল্লিশ পেরিয়ে আলোর মিছিল অনন্তের দিকে

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

চল্লিশ পেরিয়ে আলোর মিছিল অনন্তের দিকে

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চার দশক পূর্তি উৎসব উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সমকাল

আলোকিত মানুষ গড়তে চার দশক আগে হাঁটি হাঁটি পায়ে যাত্রা শুরু করেছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ১৫ জনের পাঠচক্র দিয়ে শুরু; এখন ২৮ লাখ সদস্যের বিশাল আলোর মিছিলে পরিণত হয়েছে। এই মিছিল এখন সমকাল ছাড়িয়ে অনন্তের পথে। ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর 'আলোকিত মানুষ' অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের হাত ধরে এর সূচনা। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের মধ্যে শৈল্পিক মনন গঠনে এই প্ল্যাটফর্মের পথচলার চার দশক পূর্ণ হয় ১৭ ডিসেম্বর। গতকাল শুক্রবার এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। রাজধানীর পরীবাগের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভবনে দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে নাচ, গান আর কবিতার সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল সারাদেশ থেকে সংগঠনের নতুন ও পুরনো সদস্যরা। পরিণত হয়েছিল হাজার হাজার কল্লোলিত মুখের এক উজ্জ্বল মিলন মেলায়।

গতকাল সকাল ৯টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে বর্ণিল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় চার দশক পূর্তি উৎসবের। শোভাযাত্রায় দেশবরেণ্য ব্যক্তি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অংশ নেন। আর পরীবাগের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনের দ্বিতীয় তলার মঞ্চে সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দুপুরে ঘণ্টা দেড়েকের বিরতি ছাড়া রাত ১০টা পর্যন্ত ছিল এ আয়োজন। দেশের প্রথিতযশা শিল্পীদের কণ্ঠের সুরলহরি যেমন ছিল, ছিল কথক, মণিপুরি, ভরতনাট্যম ও গৌড়িও নৃত্যের ছান্দিক পরিবেশনাও। সংগঠনের সদস্যরা আবৃত্তি, নাচ ও গান পরিবেশন করেন। পঞ্চম তলায় আলোকচিত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রের চল্লিশ বছরের সময়কে তুলে ধরা হয়। নিচতলা ও ছাদে ছিল গ্রামবাংলার মুখরোচক খাবার। বাতাসা, শিঙ্গাড়া, জিলাপি, খই ও পিঠার ঘরোয়া স্বাদে জমে উঠেছিল ছোট ছোট আড্ডা। পরিবারসহ এসেছেন অনেকেই। আয়োজন উপলক্ষে পুরনো ভবন সাজানো হয়েছিল হলুদ আর লালের অপূর্ব মাধুরিতে। দেয়ালে দেয়ালে রঙিন আলপনা। তোরণজুড়ে নানা রঙের কাগজের ফুল। স্বেচ্ছাসেবকদের গায়ে ছিল বর্ণিল আলখাল্লা। তরুণীদের বাসন্তী শাড়িতে যেন এসেছিল আগাম ফাগুন। এ উদযাপনে দেখা মিলেছে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাংবাদিক মাহফুজ আনামসহ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনের।

উৎসবে অংশ নিতে

আসা সাভারের মঈনুল হোসেন জানান, নব্বইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি যুক্ত হন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাঠ্যবইয়ের বাইরেও যে একটা বিশাল জগৎ আছে, তার সন্ধান পান কেন্দ্রের লাইব্রেরিতে গিয়ে।

যাত্রাবাড়ী থেকে একমাত্র সন্তান লাবীবকে নিয়ে এসেছেন মা আয়শা খানম। তিনি বলেন, আলোকিত মানুষ হতে হলে শুধু স্কুলের বই পড়লে চলবে না। সাহিত্যের মহান সৃষ্টিগুলোর সঙ্গে পরিচয় থাকতে হবে। তার সন্তানকে তাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য বানিয়েছেন।

১৯৭৮ সালে ঢাকা কলেজের পেছনে শিক্ষা সম্প্র্রসারণ কেন্দ্রে (বর্তমানে নায়েম) ছোট মিলনায়তনে ১৫ জনের পাঠচক্র দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের। সে সময় ১০ জন তরুণের জন্য দশটি বই কিনতে একজনের দান করা ৩৪ টাকা দিয়ে এই মহান কার্যক্রমের শুরু। চার দশকের এই পথ চলায় দেশব্যাপী ৯০ লাখ পাঠকের হাতে বই তুলে দিয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। দুই হাজার ১০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রের কার্যক্রম চলছে। নিয়মিত পাঠক সংখ্যা দুই লাখ ১৭ হাজার। জেলা ছাড়িয়ে পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে ২৫০ উপজেলায়। শুভাকাঙ্ক্ষী ও সদস্যদের সহযোগিতায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পাশাপাশি মেলে সরকারের কিছু সহায়তাও।

শুরুর দিকে ইন্দিরা রোডে একটি ভাড়া বাসায় কেন্দ্রের কার্যক্রম চলত। আশির দশকে বর্তমান স্থানে চলে আসে এটি। পরিত্যক্ত এই বাড়িটি সরকার বরাদ্দ দেয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে বহুতল ভবন গড়ে তোলা হয়। ১৯৮৪ সালে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই পড়ানোর কর্মসূচি শুরু হয়। ধীরে ধীরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় 'আলোর ইশকুল' ও ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার; যা বিকশিত করছে দেশের লাখো তরুণ-কিশোর মননকে। এর মাধ্যমে তারা তাদের 'স্বপ্নের সমান' বড় হচ্ছে। শুধু বই পৌঁছে দিয়ে নয়, নিজেরাই বিশ্ব ও দেশের সেরা সাহিত্যগুলো একত্রিত করে এবং গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করে পাঠক সমাজের কাছে তুলে দিচ্ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার এক লেখায় বলেছেন- 'অনেক আলোকিত মানুষ চাই আমাদের, চাই অনেক সম্পন্ন মানুষ, না হলে এই জাতিকে শক্তি ও সম্ভাবনার দরজায় উত্তীর্ণ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হবে।' তাই সবার প্রত্যাশা আলোর এই মিছিল আরও অনন্তকাল ধরে আলোকিত করে যাক তরুণ-কিশোর-শিশুদের।