হাসপাতাল-ক্লিনিকের কাপড় ধোয়া হচ্ছে সুরমায়

চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রোগীরা

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

চয়ন চৌধুরী, সিলেট

হাসপাতাল-ক্লিনিকের কাপড় ধোয়া হচ্ছে সুরমায়

সিলেটে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নোংরা কাপড় ধোয়া হয় সুরমা নদীতে। ছবিটি নগরীর কাজিরবাজার এলাকা থেকে তোলা সমকাল

প্রতিনিয়ত দূষণের শিকার হচ্ছে সিলেটের প্রাণ সুরমা নদী। আশপাশের বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের উচ্ছিষ্ট অহরহ মিশছে পানিতে। তীরবর্তী কলকারখানার বর্জ্য মেশার পাশাপাশি প্লাস্টিকের নানা জিনিস নদীতে ভাসে। এই পানিকে আরও বড় ধরনের দূষণের মুখে ঠেলে দিচ্ছে নগরীর বিভিন্ন ক্লিনিক-হাসপাতাল। নদীর পানিতে ধোয়া হচ্ছে হাসপাতাল-ক্লিনিকে রোগীদের ব্যবহূত কাপড়চোপড়। এতে যেমন পানিতে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু মিশছে, তেমনি দূষিত পানিতে ধোয়ায় কাপড়গুলো জীবাণুমুক্ত হচ্ছে না। ফলে নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। এসব জীবাণুযুক্ত কাপড় ব্যবহার করে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদীর কিস্ফনব্রিজ থেকে কাজিরবাজার ব্রিজ পর্যন্ত এলাকায় পানিতে অসংখ্য প্লাস্টিকের বোতল ও ময়লা-আবর্জনা ভাসছে। নদীতীরের বিভিন্ন ছোট ছোট কারখানার তেল-মবিলও মিশছে অবাধে। আবার এই দুই ব্রিজের মাঝের প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে নদীর পানিতেই গোসল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ সারছেন নানা বয়সের নারী-পুরুষ। এসবের মাঝেই কাজিরবাজার ব্রিজের নিচের উত্তর পাড়ে বিভিন্ন ক্লিনিকের শত শত কাপড় ধোয়া হচ্ছে। নগরীর বেসরকারি বিভিন্ন ক্লিনিক-হাসপাতালে রোগীদের ব্যবহূত কাপড় ধোয়ার পর শুকানো হচ্ছে নদীতীরের ঢালে। এসব কাপড়ের মধ্য থেকে বেডশিট থেকে শুরু করে আইডিইউ ও অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহূত কাপড়চোপড়ও রয়েছে।

সুরমা নদীতীরের তোপখানার বাসিন্দা আফতাব মিয়া বলেন, 'বিকল্প না থাকায় নদীতে গোসল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ সারতে আসেন আশপাশের অনেকে। শুস্ক মৌসুমে নদীর পানি ব্যবহারের হার বেড়ে যায়।' সাম্প্রতিক সময়ে নদীর পানি দূষণ চরম মাত্রায় পৌঁছেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আজকাল অনেকের শরীরে চুলকানিসহ নানা ধরনের চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে।'

নদীর পানিতে

ক্লিনিক-হাসপাতালের রোগীদের ব্যবহূত কাপড় ধোয়ার জন্য নিয়ে এসেছেন বেশ কয়েকজন যুবক। কাজিরবাজার এলাকার একটি লন্ড্রিতে কাজ করার কথা একজন স্বীকার করলেও বাকিরা কথা বলতে রাজি হননি। এই প্রতিবেদকের পরিচয় অনুমান করে বেডশিটগুলোতে লেখা বিভিন্ন ক্লিনিকের নাম লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন তারা।

এসবের মধ্যে নগরীর কাজলশাহের বেসরকারি জালালাবাদ ক্লিনিক, লামাবাজারের আয়েশা মেডিকেয়ারের কাপড় দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকার ক্লিনিক ও হাসপাতালের কাপড় প্রতিদিন সুরমা নদীতে ধোয়া হয়। এসব কাপড়ে অনেক সময় রক্ত থেকে শুরু করে বিভিন্ন জিনিস লাগানো থাকে বলে জানিয়েছেন তারা।

কাজিরবাজার এলাকার আবদুল হক বলেন, 'গরিব কর্মজীবী মানুষ বলে বাধ্য হয়ে নদীতে গোসল করতে আসি। কিন্তু পানির দিকে তাকালে ভয় করে। এখন আবার এই পানিতে রোগীদের কাপড় ধোয়া হয়!'

যে কোনো নদী বা জলাধারের পানি ব্যবহারের উপযোগিতা পরীক্ষা করে থাকে পরিবেশ অধিদপ্তর। তবে পানিতে রোগ-জীবাণুর উপস্থিতি সেভাবে পরীক্ষা করা হয় না বলে জানিয়েছেন সিলেটে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাসেল নোমান। তিনি বলেন, 'অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পুকুর, নদী বা জলাধারের পানি পরীক্ষা করা হয়। সুরমা নদীর পানি পরীক্ষা করা হয় বলে জানান তিনি। এ ব্যাপারে সিলেটে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'নদীর পানির গ্রহণযোগ্যতা বিভিন্ন সময় পরিমাপ করা হয়। এই পরীক্ষায় মূলত পানির সাধারণ ব্যবহারের বিষয়টি দেখা হয়। তবে এই পানিতে জীবাণু রয়েছে কি-না, তা পরীক্ষা করা হয় না। এ জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নেই আমাদের।'

সুরমা নদীর পানিতে হাসপাতাল-ক্লিনিকের রোগীদের কাপড় ধোয়াকে 'ভয়াবহ' বলে অভিহিত করেছেন সিলেটের সিভিল সার্জন হিমাংশু লাল রায়। একে চিকিৎসাশাস্ত্রের নৈতিকতা পরিপন্থী উল্লেখ করে তিনি সমকালকে বলেন, 'মেডিকেল এথিক্স মানলে ক্লিনিক বা হাসপাতালে রোগীদের ব্যবহূত কাপড়চোপড় বিশুদ্ধ, পরিস্কার ও দূষণমুক্ত পানিতে ধৌত করতে হবে। সুরমা নদী এমনিতেই নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। এই পানিতে রোগীদের কাপড় ধোয়া হলে তা পরিস্কার হওয়ার বদলে রোগ-জীবাণু ছড়াবে। এতে রোগীদেরও বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।'

সিলেটের অন্যতম পরিবেশবাদী সংগঠন 'ভূমিসন্তান বাংলাদেশে'র সমন্বয়ক আশরাফুল কবীর সমকালকে বলেন, 'সংশ্নিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার জন্য সুরমা নদী দূষিত হচ্ছে। এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে সিলেট নগরবাসী তথা সুরমা অববাহিকার মানুষ। সিলেটের প্রাণ সুরমা নদী। একে রক্ষা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সিলেট সিটি করপোরেশনের। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড, নদীরক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে মাস্টার প্ল্যান করে সুরমাকে রক্ষা করতে হবে।