প্রতিবাদ সভায় বিএনপি নেতারা

খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ব্যর্থ

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ব্যর্থ

শুক্রবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে খালেদা জিয়ার মুক্তর দাবিতে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় বিএনপি নেতারা- সমকাল

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির আন্দোলনসহ রাজনৈতিক অন্যান্য বিষয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। ব্যর্থতা স্বীকার করে দলের সিনিয়র নেতাদের মতে, দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু যারা নেতৃত্বে রয়েছেন তারা সফল হননি। দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেননি। তারা আবারও সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। সারাদেশে নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন এবং ত্যাগী ও তরুণদের দিয়ে দল পুনর্গঠন করে দ্রুত আন্দোলন যাওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেন।

রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গতকাল শুক্রবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সারাদেশে বন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় তারা এসব কথা বলেছেন। খালেদা জিয়ার এক বছরের কারাবন্দিত্বের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। একই ইস্যুতে আজ শনিবার সারাদেশে ঢাকা মহানগর বাদে প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করবে দলটি।

প্রতিবাদ সভায় ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা থেকে শুরু করে প্রত্যেক সিনিয়র নেতা বিগত দিনে আন্দোলনের ব্যর্থতার বিষয়টিকে সামনে আনেন। তারা হরতালসহ রাজপথের কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার জন্য দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপির পক্ষে দেশের ৮০ ভাগ মানুষের সমর্থন রয়েছে। তাদের আলোর পথ দেখানোর দায়িত্ব বিএনপির। এ জন্য তাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আর ঘুরে দাঁড়াতে হলে দলের নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করতে হবে। এ জন্য বিএনপির প্রার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে। নির্যাতিতদের পাশে যারা থাকবেন,

ভবিষ্যতে তাদের মূল্যায়ন করা হবে। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সংগঠনগুলোর দুর্বলতা সংশোধন করে সংগঠনকে শক্তিশালীও করতে হবে।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশে দুটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে। যার একটি তথাকথিত তামাশার নির্বাচন। অন্যটি হচ্ছে সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে সরকারি দলের সিনিয়র সদস্যদের বাদ দেওয়া। মন্ত্রিসভা থেকে সিনিয়রদের বাদ দেওয়া ভালো লক্ষণ হতে পারে না। পরপর এ দুটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটায় এটা স্পষ্ট, এই সরকার বেশিদিন টিকতে পারবে না।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এই নির্বাচনে একটি বিষয় প্রমাণিত হয়েছে যে, একটি দলের জনপ্রিয়তাই যথেষ্ট নয়। সংগঠন ছাড়া সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা যায় না। নির্বাচনে অনিয়মের বিরুদ্ধে কেন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারিনি, তার উত্তর খুঁজতে হবে, পর্যালোচনা করতে হবে।

মওদুদ জানান, তারা নির্বাচন করেছেন, কিন্তু আন্দোলন করেননি। তিনি আন্দোলনের লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তা মানা হয়নি। শীর্ষ নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তারা তৃণমূলের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারেননি।

ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, 'লজ্জায় মাথা অবনত হয়ে যায় যখন ভাবি, এক বছর হলো তাদের নেত্রী জেলে আছেন। তবে সময় আসছে। তৃণমূল থেকে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। নির্যাতিতদের কাছে সংগঠনের দায়িত্ব দিতে হবে। তরুণদের সামনে আনতে হবে। এটা করতে পারলে খুব শিগগিরই সরকার পতনের আন্দোলনের সময় আসবে।' আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটিয়ে তাকে মুক্ত করা হবে।

ড. আবদুল মঈন খান বলেন, খালেদা জিয়া রাজনীতির সামনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেছেন। জিয়াউর রহমানের দেখানো পথে গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। এ কারণে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, তারা সবাই আজ লজ্জিত। সবাই ব্যর্থতা ও লজ্জা নিয়ে আজকে এই সভায় এসেছেন। কারণ তাদের নেত্রী এক বছর ধরে জেলে আছেন। অথচ তারা তাকে মুক্ত করতে পারেননি। তবে এই ব্যর্থতার দায়ভার নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে এবং তাকে গণআন্দোলনের মাধ্যমে মুক্ত করতে হবে।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এ মাসের বাকি ১৮ দিন অবস্থান ধর্মঘটের কর্মসূচি পালন করুন। আগামীকাল (আজ) ঢাকা মহানগরের ১০০টি ওয়ার্ডের ১০ জন করে মোট এক হাজার নেতাকর্মী নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করুন। পরদিন ৩০০ প্রার্থী একই কর্মসূচি পালন করুন। এর পর জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতারা, যারা এতদিন দলের মধু পান করেছেন, তাদের ধরে এনে এই কর্মসূচিতে যুক্ত করুন।

চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম বলেন, আলোচনা করুন- কী করেছি আর কী করতে পারিনি। আন্দোলন ও নির্বাচন একসঙ্গে করলে কোনোটাই হবে না। কারাবন্দি খালেদা জিয়ার বরাত দিয়ে অনেক নেতা বলে থাকেন, ম্যাডাম হরতাল অবরোধ দিতে নিষেধ করেছেন- এ কথা আর মানা যাবে না। হরতাল দিতে হবে। সরকারকে সরাতে কর্মসূচি দিতেই হবে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ করে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল বলেন, তারা কেউ এমপি-মন্ত্রী হতে চান না। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি চান। এর জন্য কর্মসূচি চান।

দলের প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী ও সহ-প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আলিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান, শামসুজ্জামান দুদু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল প্রমুখ।