প্রভাবশালীর দখলে রাস্তার জায়গা

কল্যাণপুরে ২০০ ফুটের জন্য হাঁটতে হয় ২ কি.মি.

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

অমিতোষ পাল

প্রভাবশালীর দখলে রাস্তার জায়গা

রাজধানীর কল্যাণপুর খালসংলগ্ন রাস্তার জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি তুলে ভাড়া দিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। এ কারণে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে এলাকাবাসীকে- সমকাল

রাস্তার জমি প্রভাবশালীর দখলে থাকায় রাস্তাটি তৈরি করতে পারছে না ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। যেখানে মাত্র ২০০ ফুট হেঁটে ৬০ ফুট প্রশস্ত সড়কে (কামাল সরণি) উঠতে পারেন এলাকাবাসী, দখলমুক্ত না হওয়ায় সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। দুই কিলোমিটার ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। লক্ষাধিক নগরবাসীকে এই বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে দিনের পর দিন। আর এই ভোগান্তি সহ্য করছেন কল্যাণপুরের ১১ নম্বর সড়কের বাসিন্দারা।

সরেজমিন দেখা গেছে, কল্যাণপুর ১১ নম্বর সড়কের শেষ প্রান্তেই কল্যাণপুর খাল। খালের পাড় ধরে প্রায় ২০ ফুট চওড়া একটি রাস্তা উত্তর দিকে চলে গেছে। কিছুদূর এগোতেই রাস্তাটা থেমে গেছে। কারণ সামনেই অবকাঠামো, দোকানপাট, বস্তিঘর প্রভৃতি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাজউকের প্ল্যানেও এটা রাস্তা হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু হাজি মমিনুল হক নামে এক ব্যক্তি ওই রাস্তার জায়গা দখল করে সেখানে ঘরবাড়ি বানিয়ে ভাড়া তুলছেন। ফলে রাস্তাটি থেমে গেছে।

ঘরবাড়ি ওঠা ওই অংশটুকু রাস্তার  জন্য উন্মুক্ত করে দিলে সেটা পার্শ্ববর্তী কল্যাণপুর খালের ওপর নির্মিত কালভার্ট পর্যন্ত যুক্ত হয়ে যায়। রাস্তা ধরে কালভার্ট পার হয়ে খুব সহজেই কামাল সরণিতে (৬০ ফুট) গিয়ে যানবাহন ধরতে পারেন এলাকাবাসী। রাস্তাটি বন্ধ থাকায় ১১ নম্বর রোড থেকে বেরিয়ে মিরপুর বাঙলা কলেজের সামনে পাইকপাড়া হয়ে পীরেরবাগ সড়ক ধরে কামাল সরণিতে উঠতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ডিএনসিসির ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেওয়ান আব্দুল মান্নান বলেন, 'ওখানে ওই ভদ্রলোকের পাঁচ কাঠা জায়গা আছে। কিন্তু তিনি আরও পাঁচ কাঠা জায়গা দখল করে রেখেছেন। এর মধ্যে দুই কাঠা খালের জায়গা। বাকি ৩ কাঠা রাস্তা তৈরির খাস জমি। এ ব্যাপারে কমিউনিটি পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছে। বৈঠকে তাকে তিন কাঠা জমি ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু তিনি তা মানেননি।'

সিদ্দিক নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ওই ভদ্রলোকের দলিলেও তার জায়গা পাঁচ কাঠাই উল্লেখ আছে। তাকে অনুরোধ করা হয়েছে অন্তত রাস্তার জায়গাটুকু ছেড়ে দিতে। খালের জায়গা দুই কাঠা রেখে দিলেও তার দুই কাঠা অতিরিক্ত দখলে থাকে। তিনি তা শোনেননি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আনিসুল হক মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ঘিঞ্জি এলাকার রাস্তাগুলো প্রশস্ত করার জন্য কাউন্সিলরদের উদ্যোগ নিতে বলেন। ওই সময় ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেওয়ান আব্দুল মান্নান রাস্তা প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেন। ১৩টি সড়ক প্রশস্ত করার কাজ শুরু হয়। রাজউক-সিটি করপোরেশনের সমন্বিত ওই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গেলে রাস্তার জায়গা দখলে থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য অনেকে ব্যক্তিগত জমিও বিনামূল্যে ছেড়ে দেন। অথচ ওই ব্যক্তি উল্টো রাস্তার জমিই দখলে রেখেছেন।

রাস্তা প্রশস্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর ওই এলাকার চেহারাও পাল্টে গেছে। এলাকায় পরিচ্ছন্নতার ছাপও এসেছে। তবে কিছু বিদ্যুতের খুঁটি রাস্তার মধ্যে থাকায় কুৎসিত লাগে একটু। সেগুলো স্থানান্তরেরও উদ্যোগ নিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা জানান, দখলে থাকা জায়গাটা ছেড়ে দিলে পুরো ওয়ার্ডের চেহারাই পাল্টে যাবে।

দখল করা ওই জমিতে রয়েছে কয়েকটি টিনশেড ঘর। আর আছে একটি ছোট টেইলার্স। ভাড়াটিয়াদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই জায়গার মালিক হাজি মমিনুল হক। তিনি বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থাকেন। বর্তমানেও দেশে নেই। তার শ্বশুর আজিজুল হকই কার্যত দেখাশোনা করেন।

আজিজুল হক বলেন, এ নিয়ে দুই-তিনবার মিটিং হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় কিছু লোক ও কাউন্সিলর মিলে তাদের মনোনীত একজন দালাল সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপা হয়েছে। মাপে মমিনুল হকের জায়গার সঙ্গে উত্তর দিকের আরেকটি জমি যুক্ত করে ১০ কাঠা দেখানো হয়েছে। পরে তাদের দেওয়া মাপের একটি কপি সংগ্রহ করে দেখি, ভুল মাপ দিয়েছে তারা। এ জন্য ওই সার্ভেয়ারকে আমিও ধরেছিলাম। সার্ভেয়ার তার ভুল স্বীকার করেছেন। এরপর আর কেউ এ নিয়ে কথা বলে না। আজিজুল হক আরও জানান, তারা কারও জায়গা দখল করেননি। বরং তাদের জায়গা ভেঙে ভেঙে খালের ভেতরে চলে গেছে। ওয়াসার লোকজনও তা জানে।