গদি রক্ষায় একজোট সিবিএ নেতারা

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০১৯

অমরেশ রায়

উচ্চ আদালত থেকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিএ) কালেক্টিভ বার্গেনিং এজেন্টের (সিবিএ) দায়িত্বে থাকা 'বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন'কে অবৈধ ঘোষণার পর সংগঠনটির নেতারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ক্ষমতা হাতছাড়া হলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে ফেঁসে যাওয়ার আতঙ্কে ভুগছেন তারা। এ জন্য সিবিএর নেতৃত্ব ধরে রাখতে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ এ সংগঠনের নেতারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিআইডব্লিউটিএ ভবনে পেশিশক্তির মহড়া এবং ঢাকার সদরঘাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইউনিয়নের শাখা কমিটিগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের নির্দেশে সহসভাপতি আকতার হোসেন এই অর্থ সংগ্রহ করছেন বলে সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেছেন।

এদিকে, হাইকোর্ট কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত সিবিএ নেতারা যে কোনো মূল্যে হাইকোর্টের রায় স্থগিতের আপ্রাণ চেষ্টা ও নানামুখী তদবির করছেন। এ জন্য আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করে অ্যাটর্নি জেনারেলের দ্বারস্থ হয়েছেন তারা। একই সঙ্গে স্থগিতাদেশ পেতে আইনি লড়াইয়ের জন্য নামিদামি কয়েকজন আইনজীবীও নিয়োগ করেছেন। স্থগিতাদেশ চেয়ে করা আবেদনের ওপর শুনানির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল মঙ্গলবার চেম্বার বিচারপতির আদালতেও গিয়েছিলেন। তবে এদিন শুনানি হয়নি।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, বিআইডব্লিউটিএ যাতে সিবিএর কার্যক্রম বন্ধ ও ইউনিয়ন কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে না দেয়, সে জন্য সিবিএ নেতারা সংস্থার কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিদিন বহিরাগতদের নিয়ে দিনভর সেখানে মহড়া দিচ্ছেন। এ ছাড়া সাধারণ কর্মচারীরা যাতে সিবিএ নির্বাচনের দাবি করতে না পারেন, সে জন্য তাদের সংস্থার নতুন চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ফ্লোটিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের কয়েকজন সদস্য নতুন চেয়ারম্যানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও তাকে স্বাগত জানাতে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয় মতিঝিল এসেছিলেন। কিন্তু আবুল হোসেন ও রফিকুল ইসলামের নির্দেশে ও তাদের উপস্থিতিতে আকতার হোসেনসহ কয়েকজন বহিরাগত ফ্লোটিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সদস্যদের কাছ থেকে ফুলের তোড়া কেড়ে নিয়ে তাদের ভবন থেকে তাড়িয়ে দেন। এরপর ইউনিয়নের ওই সংগঠনের সদস্যদের শাস্তিমূলক বদলির প্রক্রিয়াও শুরু করেন সভাপতি-সম্পাদক। তবে সংস্থার চেয়ারম্যান বদলির প্রস্তাবে অনুমোদন দেননি।

ভুক্তভোগীরা আরও অভিযোগ করেছেন, ওই তিন সিবিএ নেতা প্রতিদিন বিআইডব্লিউটিএ ভবনের বিভিন্ন শাখায় গিয়ে কর্মচারীদের নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। নির্বাচন চাইলে ঢাকার বাইরে বদলি, এমনকি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মোবাইল ফোনেও বিভিন্ন স্থানের কর্মচারীদের একই হুমকি দিচ্ছেন আবুল হোসেন ও রফিকুল ইসলাম। এ দু'জনের ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করলে এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। এ দুই নেতা প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন, আদালত তাদের বিপক্ষে রায় দিলেও যতদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন তারা সিবিএ নেতা থাকবেন। কেউ তাদের ইউনিয়ন কার্যালয় বন্ধ করতে পারবে না।

বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের মেডিকেল অ্যাটেনডেন্ট মুজিবর রহমানের দায়ের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর দ্বৈত

বেঞ্চ গত ১১ মার্চ বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নকে (নিবন্ধন নম্বর বি-২১৭৬) অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। সংগঠনটি এতদিন সিবিএর দায়িত্ব পালন করে আসছিল। এ ছাড়া রায়ে সিবিএ কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা এবং ৩০ দিনের মধ্যে এই সংগঠনের নিবন্ধন বাতিলের জন্য শ্রম অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর আগে বিআইডব্লিউটিএর সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সমকালসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও কর্মচারীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবদুছ ছাত্তার শেখ। এ ছাড়া সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একজন অনুসন্ধান কর্মকর্তাও নিয়োগ করেছে। এসব তদন্তে সভাপতি আবুল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ও সহসভাপতি আকতার হোসেন ফেঁসে যাবেন- এ আশঙ্কায় তারা যে কোনো মূল্যে সিবিএ নেতৃত্ব ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।