পঙ্গুত্বের বড় কারণ সড়ক দুর্ঘটনা

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯      

রাজবংশী রায়

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় গত বছর জুলাই মাসে দেশজুড়ে উত্তাপ ছড়িয়েছিল। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাদেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে। তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাও। পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষও হয়। ঘটে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা। সেই প্রেক্ষাপটে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারও বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, যার কিছু বাস্তবায়নও করা হয়।

এত কিছুর পরও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি। সংশ্নিষ্টরা বলেছেন, সড়ক, নৌপথ, রেলপথ, আকাশপথে চলাচলকারী যান কম-বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়। তবে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটে সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিনই তা ঘটছে। মানুষ হতাহত হচ্ছে। অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক পরিবার পথে বসছে। কেউ আবার পরিবারের কাছে বোঝায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব পঙ্গু দিবস। সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে ১৩তম স্থানে রয়েছে। এই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর হাজারো মানুষ হতাহত হচ্ছে। এর পরও বাংলাদেশে এই দিবসটি সরকারি-বেসরকারি কোনোভাবেই পালন করা হয় না।

সরকারিভাবে দিবসটি কেন পালন করা হয় না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় আর্থোপেডিক পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল গনিহ মোল্লা সমকালকে বলেন, বিশ্ব পঙ্গু দিবসটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে পালন করা হয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দিবসটি পালনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পঙ্গুত্বের মূল কারণ সড়ক দুর্ঘটনা : দুর্ঘটনায় হতাহতদের নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি। তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে বিভিন্ন পরিবহনের ছয় হাজার ৪৮টি দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৭৯৬ জন নিহত এবং ১৫ হাজার ৯৮০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সড়কে পাঁচ হাজার ৫১৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে সাত হাজার ২২১ নিহত এবং ১৫ হাজার ৪৬৬ জন আহত হয়েছেন। এর পরই রেলপথে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেলপথে ৩৭০টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং ২৪৮ জন আহত হয়েছেন। এর পর রয়েছে

নৌপথ ও আকাশপথে হতাহতের ঘটনা। নৌপথে ১৫৯টি দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত, ২৩৪ আহত এবং ৩৮৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আকাশপথে ৫টি দুর্ঘটনায় ৫৫ নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন।

সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ছয় হাজার ৫৮১টি দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৬৪২ নিহত এবং ২২ হাজার ৮৫৫ জন আহত হন। ২০১৬ সালে চার হাজার ৩১২টি দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত এবং ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জন নিহত ও ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করেছে। এতে দেখা যায়, আট বছরে ১৯ হাজার ৪৫০টি দুর্ঘটনায় ১৮ হাজার ৫১০ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৪৪২ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে ১৭৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১৬৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৭৩ জন। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশেরও বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩৪৯ থেকে ২৫ হাজার ২৮৩ জনের মধ্যে। অথচ বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৯৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এআরআইর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সামছুল হক জানান, বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য পুলিশ সংরক্ষণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশ সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে না। তারা আন্ডার রিপোর্টিং করে। এ জন্য তাদের জবাবদিহিতাও করতে হয় না। পুলিশের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় বলে দিচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাচ্ছে। এসব কারণে পদ্ধতিটি আরও বেশি অকার্যকর হয়ে উঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করতে সবার আগে সঠিক তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

জাতীয় আর্থোপেডিক পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) সূত্রে জানা গেছে, এই হাসপাতালে ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮ লাখ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ রোগীর অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। নিটোরের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বছরে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার থেকে এক লাখ ৩০ হাজার রোগী এ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। প্রায় ৫০ হাজার রোগী জরুরি বিভাগ থেকে সেবা নেন। এই রোগীদের মধ্যে বছরে সাড়ে তিন থেকে চারশ' রোগী পঙ্গুত্ববরণ করেন। তবে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার সংখ্যা বেশি বলে জানান তিনি।

আর্থোপেডিক সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আমজাদ হোসেন বলেন, দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আহত হয়ে যত মানুষ ভর্তি হন, তাদের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যাই বেশি। চিকিৎসার মাধ্যমে আহতদের একটি অংশ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। তবে বড় একটি অংশ চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তিনি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দেন।