অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতিতে তিন শতাধিক পোশাক কারখানা

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯      

আবু হেনা মুহিব

কারখানায় কর্মপরিবেশের দুর্বলতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে পোশাক শিল্পকে। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করেই মার্কিন অগ্রাধিকারভিত্তিক বাজার বা জিএসপি সুবিধা স্থগিত রয়েছে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করেই দেশের প্রায় সব কারখানা পরিদর্শন করেছে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার পৃথক দুটি ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স। কমপ্লায়েন্স (মানসম্পন্ন উৎপাদনে সহায়ক শর্ত) শর্ত পূরণ না হওয়ায় অনেক কারখানার রফতানি আদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ক্রেতারা। কাজের অভাবে বন্ধ হয়েছে একের পর এক কারখানা। এতকিছুর পরও কমপ্লায়েন্স ইস্যুকে যথেষ্ট আমলে নিচ্ছে না কিছু কারখানা।

গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পোশাক কারখানাগুলো পরিদর্শন করে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। তারা মাত্র এক হাজার ৩৫১ কারখানা পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এখনও ৩১১টি পোশাক কারখানা অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঘাটতি নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা গড়ে এক হাজার। পরিদর্শন করা কারখানাগুলোর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা ৯৪৬টি, বিকেএমইএর ৩৭৬টি ও অসংগঠিত বা কোনো সমিতির সদস্য নয় এরকম কারখানার সংখ্যা ২৯টি।

অবশ্য পোশাক কারখানাগুলোতে আগের চেয়ে কাজের পরিবেশ ও আগুনের ঝুঁকি অনেক কমেছে। অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্সের কার্যক্রমে বর্তমানে পোশাক কারখানায় কাজের পরিবেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। পাশাপাশি রফতানিও বাড়ছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এখনও কিছু পোশাক কারখানায় যতটুকু ঝুঁকি আছে, তা দূর করতে হবে। এখানে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ এসব কারখানায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার জন্য গোটা দেশকেই বড় খেসারত দিতে হবে। পোশাকই দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস। ফলে এদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

ডিআইএফইর পরিদর্শনের বাইরে আরও প্রায় আড়াই হাজার কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনের নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা এখন পাঁচ হাজার ৯৯৬টি। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। দুই বছর আগে এক হাজার ১৬৩ কারখানা বন্ধের একটি তালিকা প্রকাশ করে বিজিএমইএ। রানা প্লাজা ধসের জেরসহ বিভিন্ন কারণে এসব কারখানা বন্ধ হয়েছে। ঘোষণার বাইরেও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিজিএমইএর দুই হাজার ৪০০ কারখানা রফতানি আদেশের বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির অনুমতি সনদ বা ইউডি নেয়। অর্থাৎ এই কারখানাগুলোই সরাসরি রফতানির সঙ্গে জড়িত। এর বাইরে এক হাজার ২০০ কারখানা অন্য কারখানার রফতানি আদেশের পণ্য উৎপাদন অর্থাৎ সাব-কন্ট্রাক্ট বা ঠিকা কাজ করে থাকে। পোশাক খাতের অন্য সংগঠন বিকেএমইএর নিবন্ধিত দুই হাজার কারখানার মধ্যে উৎপাদনে আছে এক হাজার ১০০টি। এই দুই সংগঠনের বাইরে আরও কিছু কারখানা আছে। জাতীয় কর্মপরিকল্পনার (এনপিএ) অধীনে এসব কারখানার সংস্কার চলছে।

গবেষক এবং বাণিজ্য বিশ্নেষকরা বলছেন, অগ্নিনিরাপত্তাসহ কমপ্লায়েন্স শর্ত প্রতিপালনের বিষয়টিকে পোশাক খাতের অস্তিত্বের স্বার্থেই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসে

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এবং পরে রানা প্লাজা ধসের নির্মম অভিজ্ঞতার পর নতুন করে আর কোনো দুর্ঘটনার চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা পোশাক খাতের নেই। ফলে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সব দুর্বলতা সারিয়ে উঠতে হবে। বিশেষ করে অগ্নিঝুঁকির বিষয়টি বেশি বিধ্বংসী হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে এখানে মনোযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, অবশ্য এরই মধ্যে বড় কারখানাগুলো সব ধরনের ত্রুটি কাটিয়ে উঠেছে। ছোট কারখানাগুলোতেও সমান মনোযোগ দিতে হবে। কারণ দুর্ঘটনা হলে ছোট-বড় বিবেচনা করা হবে না। ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে গোটা খাতেরই।

ডিআইএফইএর প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান সমকালকে বলেন, পরিদর্শনে বলা হয়েছে, অগ্নিনিরাপত্তা কার্যক্রম সম্পূর্ণ শেষ করা হয়নি। দুই ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্সও প্রায় একই কথা বলেছে। ফায়ার হাইড্রেন্ডসহ কিছু কিছু ইক্যুইপমেন্ট সংযোজন সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আবার কোনো কারখানায় হয়তো সামান্য কাজ বাকি আছে। সেগুলোর কাজ চলছে। আসলে সংস্কার তো একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটা চলছে। অচিরেই গোটা খাত শতভাগ কমপ্লায়েন্স শর্ত প্রতিপালনে সক্ষম হবে। কারণ, আজকের যুগে কমপ্লায়েন্স দুর্বলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

ডিআইএফইর পরিদর্শনে অগ্নিনিরাপত্তার বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ত্রুটি পাওয়া গেছে। পরিদর্শনে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ত্রুটি পাওয়া গেছে ২৮ শতাংশ কারখানায়। দুর্ঘটনা সংক্রান্ত নোটিশের ক্ষেত্রে দুর্বলতা শনাক্ত হয়েছে ৩৯ শতাংশ কারখানায়। পরিদর্শনে এ রকম মোট ২৪টি সূচকের প্রায় প্রত্যেকটিতেই কোনো না কোনো দুর্বলতা পাওয়া গেছে। তবে কোনো কারখানায় নিষিদ্ধ শিশুশ্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আলো-বাতাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও পাওয়া গেছে শতভাগ কারখানায়।

অগ্নিনিরাপত্তা ঝুঁকি নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে- জানতে চাইলে ডিআইএফইর উপপ্রধান পরিদর্শক (ডিআইজি) মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, সংস্কারে পিছিয়ে থাকা কারখানাগুলোকে এরই মধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত যেসব কারখানা সংস্কারে অনেক পিছিয়ে রয়েছে, তাদের ইউডি সেবা বন্ধ রাখতে সংগঠন দুটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই চিঠি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছেও দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো কারখানার ক্ষেত্রে লাইসেন্স নবায়ন স্থগিত রাখার জন্যও স্থানীয় প্রশাসনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বিকেএমইএ কী ব্যবস্থা নিচ্ছে- জানতে চাইলে সংগঠনের সহসভাপতি ফজলে এহসান শামীম সমকালকে বলেন, অগ্নিনিরাপত্তাসহ কমপ্লায়েন্সের কোনো দুর্বলতার বিষয়ে আপস করছেন না তারা। দুর্বলতা পাওয়া কারখানাগুলোকে আগামী রোজার ঈদ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক নিরাপত্তা উন্নয়ন দেখাতে না পারলে কারখানাগুলো বন্ধ করে দেবে বিকেএমইএ। এই কারখানাগুলোকে নোটিশ দিয়ে আগেই সতর্ক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।