আবারও বসতি উঠছে ভেড়া মার্কেট বস্তিতে

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৯      

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

আগুনে পুড়ে আটজনের প্রাণহানি ঘটার পরও নতুন করে বসতি উঠছে চট্টগ্রামের ভেড়া মার্কেট বস্তিতে। অথচ দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি কর্ণফুলী নদীতীরের এ খাস জায়গা অবৈধ দখলদারমুক্ত করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু দখলদাররা পরস্পরের যোগসাজশে আবারও বস্তি নামের মৃত্যুফাঁদ তৈরির খেলায় মেতে উঠেছে। তাই নদীর একদিকে চলছে উচ্ছেদ পর্ব, অন্যদিকে শুরু হয়েছে নিঃস্ব মানুষদের দাবার ঘুঁটি বানিয়ে বসতি স্থাপন।

জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া তদন্ত কমিটির ১০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই ঘিঞ্জি এ বস্তিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আগুন লাগে। এতে ১৮২ পরিবারের অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ তাদের সব কিছু হারান। মারা যান নারী-শিশুসহ আটজন। কলোনি তৈরি করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদ্যুতের লাইন টানার কারণে এ আগুন লাগে। অবশ্য যারা এখানে ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছিলেন, তাদের কেউই এখানে থাকতেন না।

তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাশহুদুল কবির জানান, অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত এ জায়গা পুনরুদ্ধারের সুপারিশ করেছেন তারা। প্রত্যক্ষদর্শী ২২ জনের সাক্ষ্য নিয়ে তারা অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিতও করেন। ফরিদ সওদাগরের কলোনিতে থাকা নূরজাহানের ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। দখলদার হিসেবে এখানে অনেকে থাকলেও পুরো বস্তি ছিল ফরিদ সওদাগর, আবদুস সাত্তার, আবু তৈয়ব, নূরুল আমিন, হাজি আজিজ ও কবির নামের ছয় ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে। বস্তির দুই-তৃতীয়াংশ ঘরের মালিকও ছিলেন তারা। পোড়া বস্তিতে নতুন করে ঘর তুলে দেওয়ার কাজও শুরু হয়েছে এদের উদ্যোগে।

ছয়জনের এই সিন্ডিকেটে সহযোগী হিসেবে রয়েছে- মো. আবুল কালাম, মো. নাছির, মো. বেলাল, মো. জসিম, মো. মোরশেদ, জীবন, ফরিদুল আলম, আলমগীর চৌধুরী, আমিরুজ্জামান, মো. আক্তার, হেলাল উদ্দিন, করিম সওদাগর, সেলিম সওদাগর, আক্তার কামাল, আহমদ উলল্গাহ, নূরুল হক, লোকমান, মো. হারুন, হেলেনা আক্তার, জোস মোহাম্মদ, মো. শাহ নেওয়াজ, আহমদ নবী জামাল উদ্দিন, আবু সুফিয়ান, ইয়াহিয়া খান, মো. ইয়াছিন, ওমর ফারুক, মো. বাদশা, মো. সফিকুল ইসলাম, আবদুর রশিদ ও রকিবুল হাসান। এদের প্রত্যেকেরই দখল করা ঘর ছিল ভেড়া মার্কেটের পুড়ে যাওয়া বস্তিতে। দুই কক্ষের প্রতিটি ঘর দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা হিসেবে ১৮০টি ঘর থেকে মাসে লাখ টাকা ভাড়া তুলত এ সিন্ডিকেট। পুরানো 'আয়' ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, 'নদীতীরের জায়গা সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। এ জায়গায় অবৈধভাবে ঘর তুলে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। আগুন লেগে সেখানে আটজনের মৃত্যু ঘটেছে। শুনেছি সেখানে আবারও ঘর তোলা হচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।'

সরেজমিন দেখা যায়,

পুড়ে যাওয়া ভেড়া মার্কেট বস্তিতে নতুন করে ঘর তোলা হচ্ছে। ফরিদ সওদাগর ও আবদুস সাত্তার প্রথমে এ উদ্যোগ নেন। আগের ভাড়াটিয়াদের বস্তি ছেড়ে অন্যখানে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে তাদের পক্ষ থেকে। বলা হচ্ছে প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই তারা ঘর তুলে দেবে। এ প্রসঙ্গে জানতে দখলদারদের সিন্ডিকেটের অন্যতম ফরিদ সওদাগরকে একাধিকবার রিং করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে নদী তীর দখল করে বসতি স্থাপন প্রসঙ্গে এর আগে তিনি সমকালকে বলেছিলেন, নদীতীরে হলেও এটি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গা নয়। দখলি স্বত্বে তারা এ জায়গার মালিক এবং দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এখানে বসতি রয়েছে। আদালতের রায়ও তাদের পক্ষে আছে।

বস্তির সর্বস্ব হারানো নৌকার মাঝি আবদুর রহমান বলেন, 'ফরিদ চেয়ারম্যানের ভাড়াটিয়া ছিলাম। চলে যেতে চাইলেও হুমকি-ধমকি দিয়ে থাকতে বাধ্য করছে। বলছে নতুন করে ঘর তুলে দেবে।'