'সিনিয়র-জুনিয়র' দ্বন্দ্বের বলি চার বছরের শিশু

নিখোঁজের তদন্তে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর ঘটনা

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০১৯      

ইন্দ্রজিৎ সরকার

কারখানার শ্রমিক সেলিম শেখের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এক কিশোরের (১৬)। একসময় সেই কিশোর দাবি করে বসে, সে 'সিনিয়র' অর্থাৎ বয়সে বড়। তাই তাকে ও তার বন্ধুদের 'বড়ভাই' বলে ডাকতে হবে, সম্মান করতে হবে। কিন্তু সেলিম মানতে রাজি হয়নি তা। এই তুচ্ছ বিষয় নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত। আর শেষ পর্যন্ত তা গড়ায় এক ভয়ঙ্কর পরিণতিতে। প্রতিশোধ নিতে সেলিমের ছোট ভাই সৌরভ শেখকে (৪) শ্বাস রোধে হত্যা করে সেই কিশোর ও তার বন্ধু রহমত উল্লাহ। গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে স্বজনদের ধারণা ছিল, খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে শিশুটি। এ বিষয়ে একটি জিডিও করেছিলেন তারা। পরে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। সম্প্রতি আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে মর্মান্তিক সেই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছে রহমত উল্লাহ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ডেমরা জোনাল টিমের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার নাজমুল হাসান ফিরোজ সমকালকে বলেন, 'নিষ্পাপ শিশুটিকে হত্যা করে ঝিলের কচুরিপানার মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয় লাশ। পরে এক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে ঝিলে মাটি ফেলে ভরাট করে রাখে। এতে শিশুটির লাশ খুঁজে পেতে সমস্যা হয়। কারণ লাশটি মাটির অনেক নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। একপর্যায়ে আসামিদের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী যন্ত্রের সাহায্যে মাটি কাটা শুরু হয়। দীর্ঘ সময় মাটি কাটার পর শুধু একটি হাড় উদ্ধার করা যায়। সেটি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।'

তদন্ত সংশ্নিষ্টরা জানান, যাত্রাবাড়ীর নয়ানগর এলাকার একটি ইলেক্ট্রিক সুইচ তৈরির কারখানায় কাজ করত হত্যায় জড়িত কিশোর ('শিশু আইন ২০১৩' এর নির্দেশনা অনুযায়ী তার পরিচয় প্রকাশ করা হলো না)। আর ১৮ বছর বয়সী সেলিম শেখ একটি পিতলের সামগ্রী তৈরির কারখানার কর্মচারী। একই বাসায় ভাড়া থাকার সুবাদে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে। কিন্তু একসময় 'সিনিয়র-জুনিয়র' (কে ছোট কে বড়) নির্ধারণ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। বিরোধের জের ধরে বছরখানেক আগে কিশোরকে মারধর করে সেলিম। এতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয় সে। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেলিমের ছোট ভাইকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন বিকেলে বাসার সামনে থেকে ডেকে নেয় সৌরভকে। মোবাইল ফোন কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাকে নিয়ে যায় ঘটনাস্থল পর্যন্ত।

হত্যায় জড়িত রহমত উল্লাহ ওরফে রকমত উল্লাহ আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করে, যাত্রাবাড়ীর কাজলার পাড় এলাকায় চিপস তৈরির একটি কারখানায় কাজ করে সে। হত্যায় জড়িত কিশোরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তার। একদিন ওই কিশোর জানায়, সে সেলিম নামে একজনের ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়। সেলিম নাকি কয়েকবার মারধর করেছে তাকে। প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে বললে রাজি হয় রহমত উল্লাহ। ঘটনার দিন বিকেল ৪টার দিকে সে ওই কিশোরের সঙ্গে কাজলারপাড়ের মেথুন এলাকায় যায়। সেখানে বসে পরিকল্পনার পর তাকে রেখে চলে যায় কিশোর। কিছুক্ষণ পর সৌরভকে নিয়ে আসে সে। এরপর শিশুটিকে নিয়ে ঝিলপাড়ে

যায় তারা। সেখানে ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে ঘনিয়ে আসে সন্ধ্যা। তখন সৌরভকে কোলের ওপর বসিয়ে গলা চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে ঝিলের হাঁটুপানিতে কচুরিপানার মধ্যে লুকিয়ে রাখে তার লাশ। রহমত এ সময় কয়েকটা পাথর এনে দেয় তাকে। সেই পাথরগুলো সৌরভের লাশের ওপর দেওয়া হয়, যাতে ভেসে না ওঠে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই ডি. এম. এ. মজিদ জানান, সেলিম ও হত্যায় জড়িত দু'জন সমবয়সী। তবে অভিযুক্ত কিশোরের মা তার সন্তানকে ১৬ বছর বয়সী বলে দাবি করেন এবং কাগজপত্রও জমা দেন তার সপক্ষে। ফলে আদালত অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠান তাকে। এর আগে সৌরভ নিখোঁজ হওয়ার পর এলাকায় মাইকিং করেন স্বজনরা। তখন এক গাড়িচালক জানান, তিনি ওই কিশোরের সঙ্গে সৌরভকে যেতে দেখেছেন। কিশোরের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে পুরো বিষয়টি অস্বীকার করে সে। পরে তদন্তে সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হলে আইনের আওতায় আনা হয় তাকে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় এলাকার জনৈক গিয়াস উদ্দিনের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকত শিশু সৌরভ। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট। তাদের বাবার নাম অলি শেখ ও মা মঞ্জিলা বেগম।