গজ কাপড় কেনা শেষে দর্জিবাড়িতে ভিড়

প্রকাশ: ১৬ মে ২০১৯      

সাজিদা ইসলাম পারুল

ইচ্ছেমতো ডিজাইন ও পারফেক্ট ফিটিং দিয়ে বরাবরের মতো এবারও তৈরি পোশাকের প্রতি ঝুঁকছেন সবাই। তাই রোজার শুরু থেকেই পছন্দনীয় কাপড় কিনতে 'গজ কাপড়'-এর মার্কেটে ভিড় জমিয়েছেন ক্রেতা। কাপড় কেনা শেষে রঙ আর শেপ মিলিয়ে অনেকেই লেইস কিনেছেন। তবে নতুন পোশাক তৈরিতে সময় আর তেমন নেই। তাই ভিড়ভাট্টা এড়াতে এখনই রাজধানীর অলিগলিসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানের দর্জিবাড়িতে পোশাকের অর্ডার দিচ্ছেন অনেকে। এদিকে, অর্ডারি কাজ শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছেন দর্জি দোকানের কারিগররা। রাত-দিন পোশাকের কাটিং ও ডিজাইনের পোশাক তৈরিতে ব্যস্ত তারা।

ক্রেতারা জানান, থ্রিপিসে সব কাপড়ই থাকে বলে বাড়তি করে কোনো কাপড় কিনতে হয় না। তবে সবাই চায় একটু নিজে পছন্দ করে কাপড় কিনে জামা বানাতে। সঙ্গে ম্যাচিং করে ওড়না, সালোয়ার তো আছেই। ইসলামপুর পাইকারি বাজারসহ অন্য বিপণিবিতানগুলোতে দেশি সুতি কাপড়ের পাশাপাশি নানা রকমের কাপড় পাওয়া যাচ্ছে। সেদিকে ভীষণ ঝোঁক তরুণীদের। তবে পছন্দের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে কাতান কাপড়।

জানা যায়, একটু গর্জিয়াস জামা বানাতে কাতানের তুলনা নেই। এই কাতান দুই প্রকার- সুতি ও সিনথেটিক। সুতি কাতান গজপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা করে বিক্রি হয়। সিনথেটিক কাতান বিক্রি হয় ৩৫০ থেকে দুই হাজার টাকায়। এছাড়া, খাদি, ধুপিয়ানের মতো একরঙা কাপড়, সিল্ক্ক, জর্জেট, প্রিন্টের জর্জেট, লিলেন কাপড়ও বিক্রি হচ্ছে। প্রিন্টের সুতি গজ কাপড়ের দাম পড়বে প্রতি গজ ৩শ' থেকে ৭শ' টাকা। জুট কটন কাপড় কেনা যাচ্ছে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। চিকেন কাপড়ের গজ ৩৫০ থেকে ৮০০ টাকা, সুতির ওপর অ্যামব্রয়ডারির কাজ করা জামার কাপড় ৬৫০ টাকা গজ, অরগেন্ডি কাপড়ের ওপর সুতা আর চুমকির নকশা করা কাপড় ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সুতির মধ্যে বাটিক ও টাইডাই কাপড় ৯০ থেকে ৪০০ টাকা গজ। আর সিল্ক্কের টাইডাই কাপড়ের দাম শুরু হয় ২০০ টাকা থেকে। জর্জেটের বাটিকও দেড়শ' থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে।

রাজধানীর বসুন্ধরা মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ইতিমধ্যে ঈদ উপলক্ষে বাজারে এসেছে হরেক দাম ও মানের কাপড়। দর-দামের বর্ণনা দিতে গিয়ে 'মনে রেখ'-এর বিক্রয়কর্মী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, 'অরগেন্ডি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা গজ। সুতির লেইস কাজ ৪৫০ থেকে ১২০০ টাকা। কাতান কাজ ২০০ থেকে ১০০০ টাকা। নেটের ওপর কাজ ৬০০ থেকে ২০০০ টাকা।'

এদিকে, কাপড়ের পাইকারি কেনাকাটার দেশের অন্যতম বৃহৎ বাজার পুরান ঢাকার ইসলামপুর। রোজার পনেরো দিনে আগে থেকেই ঈদ উপলক্ষে থানকাপড়, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজের কাপড়, শার্ট-প্যান্ট, পাজামা-পাঞ্জাবি, বোরকার কাপড়, বিছানার চাদর, পর্দাসহ সব ধরনের কাপড় বিক্রি শুরু হয়। এখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, কাপড়ের বৈচিত্র্যের কারণে দেশজুড়ে ব্যবসায়ীদের কাছে ইসলামপুর মার্কেটের পণ্যের চাহিদা

বেশি। ইসলামপুর ছাড়াও এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, হাতিরপুল, ধানমণ্ডি কিংবা গুলশান এলাকায় থানকাপড় পাওয়া যায়।

এসব এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন নানা ডিজাইনের গজ কাপড়ে এরই মধ্যে সেজে উঠেছে কাপড়ের দোকানগুলো। কোনোটির প্রিন্টে নতুনত্ব রয়েছে। আবার ফেব্রিকে রয়েছে ভিন্নতা। নতুন কাপড়ের মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম রিভার সিল্ক্ক, ওয়াটার প্রিন্ট, পিস ইয়ার্ন ডাইড চেকফেব্রিক, সিকোয়েন্স, জুমার, ডিজিটাল, লামলাম কটন, লেদার প্রিন্টসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড়। নিউমার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী ওয়াসিম ফারুক বলেন, 'পোশাকে ভিন্নতা পেতে ক্রেতারা গজ কাপড় কিনে পোশাক তৈরিতেই আগ্রহী। তবে ঈদ উপলক্ষে এর চাহিদা বেড়ে যায়। কাপড়ের দামও তুলনামূলক কম থাকে।'

দর্জিবাড়িতে ভিড় :পছন্দসই পোশাকে নিজেকে সাজাতে গজ কাপড় ও লেইস কেনা শেষে দর্জিবাড়িতে ছুটছেন নগরের নারীরা। কারণ দর্জির দোকানগুলোতে ১৫-২০ রোজার মধ্যেই অর্ডার নেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন দর্জিবাড়ি ঘুরে দেখা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে গলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিপণিবিতানের দর্জির দোকান।

নিউমার্কেটের একটি দর্জির দোকানে কারিগরকে ডিজাইন দেখাচ্ছিলেন মালিবাগের বাসিন্দা মরিয়ম মনি। তিনি বলেন, 'ঈদে নিজের পছন্দনীয় পোশাক পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। নিজের ডিজাইন করা পোশাকে নিজেকে সাজানোর মধ্যেই অন্যরকম আনন্দ রয়েছে।'

চাঁদনী চকের তৃতীয় তলার দর্জির দোকানে গিয়ে দেখা যায়, মেয়েদের উপচেপড়া ভিড়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিয়মিত ক্রেতা। তবে ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে ছুটে আসেন তারা। ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী আফরিন জাহান বলেন, 'চাঁদনী চকে নিয়মিত পোশাকের অর্ডার দিই। কারণ এখানকার কারিগরের সেলাই ও কাজ নিখুঁত। কদিন পরে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাব বলেই পছন্দের ডিজাইনের পোশাকের অর্ডার দিতে এসেছি।' এদিকে অনেকেই মোবাইল থেকে কাটিং মাস্টারকে সালোয়ার-কামিজ ও ব্লাউজের নকশা দেখাতে ব্যস্ত। এখানকার কাটিং মাস্টাররা জানান, গরমের কারণে সুতি পোশাকের ফরমায়েশ বেশি মিলছে এখন। পাশাপাশি লম্বা কুর্তা, টিউনিক, ফ্রক স্টাইলের কামিজও চলছে বেশ। সেসব পোশাকে ব্যবহূত হচ্ছে বাহারি লেইস, নানান ধরনের বোতাম। তবে বরাবরের মতো পোশাকের ছাঁটে ও হাতায় বৈচিত্র্য চাহিদার শীর্ষে। সালোয়ার-কামিজ তৈরিতে ৬০০ টাকা থেকে শুরু করে নকশা ও কাপড়ভেদে মজুরি বাড়বে। ব্লাউজের ক্ষেত্রেও তাই।

গুলশান, লালমাটিয়া, ধানমণ্ডি ও উত্তরা এলাকার কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামার জন্য বিদেশি ক্যাটালগ থেকে গলা ও হাতার নকশা পছন্দ করছেন বেশিরভাগ নারী। উত্তরার বাসিন্দা তানিয়া রহমান বলেন, 'গরমে ঈদ হওয়ায় এবার সুতির কাপড়ই পছন্দ। ডিজাইনের ক্ষেত্রে কনুই পর্যন্ত হাতা রেখেছি। সঙ্গে স্লিম ফিট। মূলত নিজেকে নতুন করে রাঙিয়ে তুলতে তৈরি পোশাক পছন্দ হয়।'