৯৭ শতাংশ কৃষক সরকারকে ধান দিতে পারবেন না

প্রকাশ: ২৩ মে ২০১৯      

পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের সাড়ে তিন লাখের মধ্যে মাত্র ১২ হাজার কৃষক সরকারকে ধান দিতে পারবেন। অর্থাৎ শতকরা ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ কৃষক সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রি করতে পারবেন। আর এ জেলা থেকে ধান কেনা হবে মাত্র ৬ হাজার ৫০৮ টন। বিষয়টি নিয়ে বাকি প্রায় ৯৭ শতাংশ কৃষক দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কৃষক নেতারা বলছেন, বাকি বিপুল পরিমাণ ধান কৃষকরা কোথায় বিক্রি করবেন। সেক্ষেত্রে তাদের উৎপাদন খরচ ওঠা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তারা আরও বলছেন, ধান-চাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে কৃষকের কথা ভাবছে না সরকার। এ অবস্থায় পরের বছর ধান উৎপাদন ছেড়েও দিতে পারেন অনেক কৃষক।

সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় সাড়ে তিন লাখ কৃষক বোরো চাষাবাদ করেন। এবার বোরো চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ১৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে, আবাদ হয়েছে দুই লাখ ২৪ হাজার ৪০ হেক্টরে। উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টন ধান।

সরকার সাড়ে ৩ লাখ কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনলে প্রতি কৃষকের কাছ থেকে ১৮ দশমিক ৫৯ কেজি কিনতে পারবেন। জেলা ধান ক্রয় কমিটি কেবল প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ধান কেনার বিষয়টি যাতে স্বচ্ছ হয়, সেজন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক এবং উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে ক্রয় কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। ১১ উপজেলায় ওই কমিটিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মনোনীত দুই প্রতিনিধি এবং আরেক সরকারি কর্মকর্তা থাকবেন। এই কমিটি কার্ডধারী কৃষকদের মধ্য থেকে ধান নেওয়ার তালিকা করবে। তালিকার কৃষকদের কাছ থেকেই কেবল ধান কেনা হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক বশির আহমদ বলেন, 'ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র-প্রান্তিক কৃষকদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র-প্রান্তিক কৃষকরা ১২০ কেজি পর্যন্ত ধান দিতে পারবেন। যারা আগে আসবেন, তাদের ধান আগে নেওয়া হবে।'

কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, সরকারের এমন সিদ্ধান্তে প্রান্ত্মিক কৃষকদেরও কোনো লাভ হবে না। ১২ হাজার কৃষকের কাছ থেকে ৬ হাজার ৫০৮ টন ধান কেনা হলে প্রতি কৃষক ৫৪২ কেজি করে ধান দিতে পারবেন। অর্থাৎ ১২ বা ১৩ মণ ধান নিয়ে গ্রাম থেকে উপজেলা খাদ্যগুদামে গিয়ে কীভাবে পোষাবে। নানা জটিলতা পার হয়ে কৃষক ধানের যে বর্ধিত দাম পাবে, তা পথেই খরচ হয়ে যাবে। এ অবস্থায় কৃষকরা সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে হয়তোবা যাবেনই না।

জেলা সিপিবি সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান

কেনার নামে কিছু ফড়িয়া, দালাল লাভবান হবে। ১৩ মণ ধান নিয়ে সরকারি খাদ্যগুদামে গিয়ে পোষাবে না। সরকার ৩ শতাংশ কৃষকের কাছ থেকে সামান্য পরিমাণে ধান নিলেও বাকি কৃষকরা ধান কী করবেন? বিশেষ করে মধ্যবিত্ত কৃষকরা মহাবিপদে পড়েছেন। তারা চাষাবাদ ছেড়ে দেবেন এবং ভবিষ্যতে উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হবে।

'হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও' আন্দোলনের সভাপতি বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বললেন, 'সরকার ধান ক্রয়ের বিষয়ে মনোযোগী না হলে, ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে যাবে হাওরাঞ্চলে।' দেশের অন্যান্য জেলায় সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান কেনা শুরু হলেও ধান উৎপাদনের অন্যতম জেলা সুনামগঞ্জে বুধবার পর্যন্ত ধান কেনা শুরু হয়নি।

জেলা খাদ্য কর্মকর্তা জাকারিয়া মোস্তফা বলেন, সুনামগঞ্জে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কৃষক রয়েছেন, এরমধ্যে ১২-১৩ হাজার কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হবে। ৩ ভাগের এক ভাগ কৃষকের কাছ থেকে ১ টন করে ধান এবং বাকি দুই ভাগ কৃষকের কাছ থেকে ৪০০ কেজি করে ধান কেনা হবে। আগামী সপ্তাহ থেকে ধান কেনা শুরু করা যাবে।