বরাদ্দ বাড়ছে গরিবের আইনি সেবায়

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৯

আবু সালেহ রনি

মামলাজট কমাতে এবং বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি লাঘবে আওয়ামী লীগ সরকারের নতুন মেয়াদের প্রথম বাজেটে এবার বেশ কিছু সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আইন ও বিচার বিভাগের এবারের বাজেটে সবচেয়ে গুরুত্ব পেতে চলেছে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (লিগ্যাল এইড)।

এ বাজেটে সরকারি খরচে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আইনগত সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে লিগ্যাল এইড সংস্থাকে চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি বছর লিগ্যাল এইড সংস্থার জন্য বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ৭৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। তবে আগামী অর্থবছরে এ সংস্থার জন্য (২০১৯-২০) অর্থবছরে ২১ কোটি ১৬ লাখ ৩২ হাজার টাকার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার লিগ্যাল এইড কার্যক্রমকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, যার ধারাবাহিকতার প্রতিফলন ঘটেছে আগামী বাজেটেও।

আগামী অর্থবছরে আইন মন্ত্রণালয় তথা বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ থাকছে এক হাজার ৬৫২ কোটি টাকা, যা সংশোধিত চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) বাজেটের চেয়ে ৭৫ কোটি টাকা বেশি। গত ১০

বছরের বাজেট পরিসংখ্যান বিশ্নেষণে দেখা যায়, জননিরাপত্তা সরকারের অন্যতম ব্যয়ের খাত হলেও এর অধীনে আইন মন্ত্রণালয়ের আগামী বাজেট বরাদ্দে

বিচার বিভাগ প্রাধান্য পেয়েছে।

অর্থ বিভাগ প্রণীত আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, দরিদ্র অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা দেওয়া, ৬৪ জেলায় চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন ও সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে নতুন ১২তলা ভবন নির্মাণ ও বার কাউন্সিলর ভবন নির্মাণ, অধস্তন আদালতের রেকর্ড রুম নির্মাণ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নির্মাণ, ডিজিটাইজড ব্যবস্থাপনা সুবিধা এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের গাড়ি সুবিধা বাড়ানোর বিষয় অগ্রাধিকার পেয়েছে।

খাতওয়ারি বাজেট বরাদ্দ :প্রস্তাবিত বাজেটে অনুন্নয়ন খাতে এবার আইন মন্ত্রণালয়কে (সচিবালয়) ৭৭ কোটি ছয় লাখ ৮১ হাজার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ১০ কোটি পাঁচ লাখ, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়কে ৩৪ কোটি আট লাখ ৬৮ হাজার, লিগ্যাল এইড সংস্থাকে ২১ কোটি ১৬ লাখ ৩২ হাজার, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে ৩৪ কোটি আট লাখ ৬৮ হাজার, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে ২০৩ কোটি ৫০ লাখ, দেওয়ানি আদালতকে ৪২১ কোটি

৮৫ লাখ, নিবন্ধন অধিদপ্তরকে (সদর, জেলা ও উপজেলা) ৩৩৫ কোটি ৭০ লাখ, জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনকে চার কোটি ৮০ লাখ ১২ হাজার, বার কাউন্সিলকে ৭০ লাখসহ মোট ৮০১ কোটি ৪৭ লাখ সাত হাজার টাকা বরাদ্দের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া উন্নয়ন খাতে ৪৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪টি জেলা আদালত ভবন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ২৫৬ কোটি, স্ট্রেনদেনিং ক্যাপাসিটি অব জুডিসিয়াল সিস্টেম ফর চাইল্ড প্রটেকশন প্রকল্পের জন্য চার কোটি, বিচার বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য গৃহীত প্রকল্পে এক হাজার ১৫ কোটি, সাব-রেজিস্ট্রি ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ১০০ কোটি, সুপ্রিম কোর্টের ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ৩৫ কোটি এবং বার কাউন্সিল ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরে (সংশোধিত) বরাদ্দ ছিল এক হাজার ৫৭৭ কোটি ৭৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এক হাজার ৬৫২ কোটি দুই লাখ টাকা। এর মধ্যে অনুন্নয়ন খাতে এক হাজার ১৯৮ কোটি ৪২ লাখ এবং উন্নয়ন খাতে ৪৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে, বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, ১৭ কোটি মানুষের এ দেশে বাজেটে প্রতিবছরই বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ খুব কম থাকে। একটি চার লেন মহাসড়কের ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার তৈরিতে যে ব্যয় হয়, এখানকার বিচার বিভাগের জন্য বাজেট বরাদ্দ প্রায় তেমনই। গত অর্থবছরে মোট বাজেটের মাত্র ০.৩২ শতাংশ বরাদ্দ ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য, যার বড় অংশই আবার ব্যয় হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। স্পষ্টতই বোঝা যায়, সরকারের সর্বনিম্ন অগ্রাধিকারে রয়েছে আইন ও বিচার বিভাগ। তিনি আরও বলেন, বাজেটে বিচার বিভাগের চেয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রায় দেড়গুণ বেশি থাকে। এতে মনে হয়, এ দেশের মানুষের ইলিশ মাছ, গরু, ছাগলের প্রয়োজন থাকলেও ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়টি অনেকাংশেই গুরুত্বহীন।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালতগুলোতে প্রায় ৩৬ লাখ মামলা বিচারাধীন। এ অবস্থায় বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক ও অবকাঠামোর উন্নয়ন করা অত্যাবশ্যকীয়। বাজেটে বরাদ্দের ক্ষেত্রে অবশ্যই এ খাতকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।