শিশুর শ্রমে হারিয়ে যায় দুরন্ত শৈশব

আজ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৯

নাহিদ তন্ময়

ফুটপাতে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল আনুমানিক আট বছরের এক শিশু। নাক-মুখ-গলাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন। রাজধানীর শাহজাহানপুর থানা পুলিশের সহযোগিতায় স্থানীয়রা শিশুটিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে উদ্ধার হওয়া ওই শিশুটি জানায়, তার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ। ঢাকার একটি খাবারের হোটেলে সে কাজ করত। একটি প্লেট ভাঙার অপরাধে মালিক তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। পরে সে কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের একটি বাসায় কাজ করত ১০ বছরের আসমা। লেখাপড়া করানোর আশ্বাস দিয়ে তাকে রংপুর থেকে নিয়ে এসেছিলেন গৃহকর্ত্রী। কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার পর থেকে আসমাকে আর কখনোই তার বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো না। প্রায় দুই বছর চেষ্টা করে থানা পুলিশের সহযোগিতায় মেয়েটিকে উদ্ধার করে তার বাবা-মা।

সংবাদমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই এমন নির্মম সংবাদ প্রকাশ পায়। দু'মুঠো খাবারের আশায় পরিবার-পরিজন ছেড়ে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত শিশুরা প্রতিনিয়ত কীভাবে নির্যাতনের শিকার হয়, তা ফুটে ওঠে এসব প্রতিবেদনে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যায় নীরবে। আর এসব কাজে একটু এদিক-সেদিক হলেই তাদের সহ্য করতে হয় শারীরিক নির্যাতন।

'জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০১৩'-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোনো না কোনো শ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই নিয়োজিত বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার বাসা-বাড়িতে প্রায় দেড় লাখ শিশু কাজ করে। এই শিশুরা সাধারণত গ্রাম থেকে আসে। শহরে গৃহকর্মে নিয়োজিত হওয়ায় তাদের নেই দুরন্ত শৈশব। আনন্দহীন জীবনে তাদের সামনে এক ধূসর ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কিছুই নেই। পড়াশোনা তো দূরের কথা, অসুস্থ হলে চিকিৎ?সাও হয় না তাদের। সংস্থাটির হিসাবে বিশ্বে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম দিচ্ছে। এদের মধ্যে প্রায় সাড়ে আট কোটি শিশু নানা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত।

এ পরিস্থিতিতে আজ বুধবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হবে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- 'শিশুশ্রম নয়, শিশুর জীবন হোক স্বপ্নময়।' শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, আইএলও ঢাকা কার্যালয়, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে আলোচনা অনুষ্ঠান, বিশেষ প্রকাশনা, পোস্টার, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।

শ্রম মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে সরিয়ে আনার বিষয়ে ২০১৬ সালের প্রথম টার্গেট অর্জনে ব্যর্থ হয়ে আবারও ২০২১ সাল পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শিশুশ্রম নিরসন নিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেই। আর এ বিষয় নিয়ে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনাও নেই। এদিকে বাসাবাড়িতে নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুরা নিয়োজিত থাকলেও সরকারিভাবে ঘোষিত ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে গৃহকর্মকে রাখা হয়নি। শিশুর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতারা বলেন, জোরালো দাবি সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় গৃহকর্মকে অন্তর্ভুক্ত করেনি সরকার। যে কোনো শ্রমই শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তারা।

মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে অনেক ভালো আইন রয়েছে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ হয় না বলে সমাজের প্রায় প্রতিটি খাতে অবাধে শিশুশ্রম রয়েছে। আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিষ্ঠান

শিশুশ্রম বন্ধের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকার শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিন্তু প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান করা হয় না। তিনি বলেন, শিশুশ্রম নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। শিশুর শ্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণগুলো খোঁজা প্রয়োজন। অনেক পরিবার থেকে শিশুকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না। শিশু বাধ্য হয় লেখাপড়া ছেড়ে কাজে সম্পৃক্ত হতে। এ ধরনের কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, ২০১৩ সালে সাভার উপজেলায় 'এক্সপ্লয়টেশন ইন চাইল্ড লেবার কেস অব সাভার উপজেলা' শীর্ষক একটি জরিপ হয়। জরিপে অংশ নেওয়া দুই হাজার পাঁচজন শ্রমজীবী শিশুর মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। আর ৪৭ শতাংশই জানায়, মা-বাবা তাদের কাজ করতে বাধ্য করেছেন এবং ৬১ শতাংশ সপ্তাহের সাত দিনই কাজ করে।