ঠেকানোই যাচ্ছে না প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে প্রশ্ন ফাঁস

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০১৯      

সাব্বির নেওয়াজ

কোনো কাজে আসেনি সরকারের নানা উদ্যোগ ও পদক্ষেপ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চলমান সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। ২৪ মে প্রথম দফার পরীক্ষায় সাতক্ষীরায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপরও ৩১ মে দ্বিতীয় দফার পরীক্ষায় পটুয়াখালীতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এ দফায় ৪৬ জনকে আটক ও ১৩ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে। দেখা গেছে, খোদ জেলা প্রশাসনের কর্মচারীরাই জড়িয়ে পড়েছেন প্রশ্ন ফাঁসে। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় এ নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হবে মোট ৬ ধাপে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ধাপের পরীক্ষা ছিল গত ২৪ মে। ২৩ মে রাতে সাতক্ষীরা থেকে এ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে ২৯ জনকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সাতক্ষীরা থেকে উদ্ঘাটিত হলেও মূলত ঢাকা থেকে তা ফাঁস হয়েছে বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত হয়েছে। এতে সাতক্ষীরার স্থানীয় ৫ ব্যক্তির সংশ্নিষ্টতাও পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।

তবে এ বিষয়ে সাতক্ষীরা থেকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সমকালকে জানিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) মহাপরিচালক ড. এ এফ এম মনজুর কাদির। তিনি বলেন, 'নিয়োগ পরীক্ষার প্রথম ধাপে সাতক্ষীরায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য-প্রমাণ আসেনি। এ ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'

মহাপরিচালক বলেন, যে স্থানে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা শোনা যাচ্ছে, সেখানে সেদিন কোনো পরীক্ষাই ছিল না। দ্বিতীয় ধাপে সাতক্ষীরায় নিয়োগ পরীক্ষা ছিল। এ কারণে প্রতিবেদন পাওয়ার আগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে পরবর্তী ধাপে যেন এমন ঘটনা যেন কেউ ঘটাতে না পারে, সে জন্য আরও কৌশল অবলম্বন করা হবে।

জানা গেছে, ২৪ মে নিয়োগ পরীক্ষার আগে সাতক্ষীরার একটি কোচিং সেন্টার থেকে প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়ার সময় পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় চক্রের সদস্যসহ ২৯ জনকে আটক করে র‌্যাব। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ২১ জনকে ২ বছর করে দণ্ড দেন। একই দিন পটুয়াখালীতে নকল সরবরাহের সময় ধরা পড়া এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ১ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেদিন লক্ষ্মীপুরেও সোলায়মান নামে একজনকে আটক করা হয়। তিনি ফেসবুকে কথিত প্রশ্ন আপলোড করেছিলেন, যার সঙ্গে মূল প্রশ্নের মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি পরীক্ষার্থীদের।

৩১ মে অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষার দ্বিতীয় ধাপেও পটুয়াখালীতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এদিন দেশের ২৬ জেলায়

এ পরীক্ষা নেওয়া হয় একসঙ্গে। এর মধ্যে পটুয়াখালী থেকে প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে আটক করা হয় ৪৬ জনকে। তাদের মধ্যে ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ দেওয়া হয়। একজনকে করা হয় জরিমানা। বাকি ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। জানা গেছে, ৩১ মে সকালে পটুয়াখালী শহরের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে ও পরে গ্রেফতার করা হয় তাদের। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দু'জন উমেদারসহ ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ কাজে আসেনি :জানা গেছে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম দফায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর পরবর্তী ধাপে প্রশ্ন ফাঁস রোধে চার ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। যেমন :নিজ জেলার প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনায় কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে না। অভিন্ন প্রশ্নের সেট দিয়ে দ্বিতীয় ধাপে ২৬ জেলায় পরীক্ষা নেওয়া হবে না। ২ বা ৩টি জেলায় একটি অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে। প্রথম ধাপে ২৬টি জেলায় অভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এছাড়া, কেন্দ্রে কোনো পরীক্ষার্থী মুখ বা কান ঢেকে প্রবেশ করতে পারবে না। পরীক্ষার দিন সকল কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চিঠি দিয়ে নিরাপত্তা বাড়াতে অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে কোনো পদক্ষেপই কোনো কাজে আসেনি।

কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয়ভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও প্রস্তুত হয় এবারও। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণে মন্ত্রণালয়ের ১৪ সদস্যের একটি কমিটি কাজ করেছে। এবার একটি প্রশ্নপত্র করা হলেও বিন্যাস পরিবর্তন করে সেট করা হয়েছে ৮টি। ওই প্রশ্ন এনক্রিপ্ট ফরম্যাটে দুই ভাগে একটি ডিসি এবং আরেকটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। পরে দু'জনে একত্র হয়ে বিশেষ পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে ডাউনলোড করে বৃহস্পতিবার রাতে ছাপানোর ব্যবস্থা নেন।

এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এ এফ এম মনজুর কাদির সমকালকে বলেন, 'প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ আমাদের কাছেও এসেছে। কিন্তু সিস্টেম অনুযায়ী প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই।' তার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, 'পরীক্ষার আগের রাত (বৃহস্পতিবার) ৭/৮টায় প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করা হয়। পরীক্ষার ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশ্ন পাঠানো হয়েছে।'

সারাদেশে তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১ জেলার ২৪ লাখ এক হাজার ৯১৯ জন প্রার্থী প্রায় ১২ হাজার পদের বিপরীতে এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। রাজস্ব খাতভুক্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০১৮ লিখিত পরীক্ষার সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম ধাপে গত ২৪ মে, দ্বিতীয় ধাপে ৩১ মে, তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা ২১ জুন এবং চতুর্থ ধাপের পরীক্ষা আগামী ২৮ জুন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার 'প্রশ্ন ফাঁস এবং প্রশ্ন ফাঁসের মহোৎসব বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায়' কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে কোটাবিরোধী আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম 'বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংগ্রাম পরিষদ'।