ঠিকানা আবার সেই মৃত্যুকূপ

পাহাড়ে ১৬০ জনের প্রাণ হারানোর দুই বছর আজ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০১৯     আপডেট: ১৩ জুন ২০১৯      

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম ও সত্রং চাকমা, রাঙামাটি

'ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা :বসবাস ও স্থাপনা নির্মাণ করা নিষেধ'- লাল কালিতে এমন সাইন বোর্ড ঝুলছে রাঙামাটির ভেদভেদি, রূপনগর ও রেডিও স্টেশন এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ঠেকাতে জেলা প্রশাসন এমন সাইন বোর্ড লাগিয়েছে পশ্চিম মুসলিমপাড়া এলাকার পাহাড়েও। কিন্তু যেখানে এ সাইন বোর্ড আছে, তার ১০০ গজের মধ্যেই পাহাড়ের ভাঁজে নতুন করে ঘর তুলেছেন ইয়াছমিন আক্তার। পাহাড় ধসে স্বজন হারানোর পর জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হয়েছিল ঢেউটিন। সেই টিন দিয়ে জেলা প্রশাসনের নাকের ডগাতেই পাহাড়ের ভাঁজে নতুন করে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

শুধু ইয়াছমিন আক্তার নন; স্বজন হারানো নুরুল আবসার, আবদুল মতিনদেরও ঠিকানা হয়েছে আবার পাহাড়ের সেই মৃত্যুকূপে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজারসহ পাঁচটি জেলায় ২০১৭ সালের ১৩ জুন পাহাড় ধসে নিহত হয়েছিলেন ১৬০ জন। এ ট্র্যাজেডির দুই বছর পর বিভিন্ন পাহাড়ে সরেজমিন গিয়ে আবারও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি দেখতে পেয়েছে সমকাল।

স্বজন হারানো ইয়াছমিন আক্তার জানান, স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের কথা থাকলেও কথা রাখেনি কেউই। দুর্ঘটনার পর ঢেউটিন, চাল ও নগদ অর্থ দিয়ে প্রশাসন কিছুদিন সহায়তা করলেও পরে আর খবর রাখেনি। তাই ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে আবার সেই পাহাড়েই গড়েছে নতুন বসতি। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ফের পাহাড় ধসের আশঙ্কা আছে। আছে প্রাণহানির শঙ্কাও। কিন্তু তাদের কাছে এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্পও নেই।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক দেশের বাইরে থাকায় বক্তব্য নেওয়া যায়নি তার। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এসএম শফি কামাল বলেন, 'ফের যাতে পাহাড় ধসের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যেন কেউ বসবাস করতে না পারে, সেজন্য প্রচারণা চালানো হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে ৫০টি সাইন বোর্ড টানানো হয়েছে বিভিন্ন পাহাড়ে। ৩০ হাজার লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে ২২টি আশ্রয়কেন্দ্র। যাতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীরা ভারী বর্ষণ শুরু হলেই এসব আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পারে।' তদন্ত কমিটির সুপারিশের পরও কেন ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ী পুনর্বাসন করা হয়নি- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'হাজার হাজার মানুষকে কীভাবে উচ্ছেদ করব! কোথায় তাদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করব? এটি বাস্তবসম্মত নয়। তবে নতুন করে যারা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ঘর নির্মাণ করছেন, উচ্ছেদ করা হচ্ছে তাদের।'

২০১৭ সালের ১৩ জুন ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসের ঘটনায় মাটিচাপা পড়ে ভেদভেদির যুব উন্নয়ন বোর্ড এলাকা, মুসলিমপাড়া, শিমুলতলী এলাকা, সাপছড়ি, মগবান, বালুখালী, জুরাছড়ি, কাপ্তাই, কাউখালী ও বিলাইছড়ি এলাকায় পাঁচ সেনা সদস্যসহ ১২০ জন। এতে মৃত্যু হয় তাদের। চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ আরও চার উপজেলায় মারা যান ৪০ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সহস্রাধিক বাড়িঘর। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের ঢেউটিন ও চাল দিয়ে সহায়তা করা হলেও স্থায়ীভাবে পুনর্বাসিত করা হয়নি কাউকেই। অথচ এ ঘটনার পর মন্ত্রণালয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে কেউ যাতে বসতি স্থাপন করতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছিল। ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনেরও সুপারিশ করেছিল তারা। কিন্তু কোনো সুপারিশই পালন করা হয়নি পূর্ণাঙ্গভাবে।

রাঙামাটির পশ্চিম মুসলিমপাড়া, রূপনগর, রেডিও স্টেশন এলাকা, ভেদভেদি এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দুই বছর আগে যেসব স্থানে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে ফের ক্ষতিগ্রস্তরা ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন।

রূপনগর এলাকার পাহাড়ে থাকা আব্দুল মতিন জানান, পাহাড় ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তিনি। তবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে আবার ঘর নির্মাণ না করে একটু অদূরে পাহাড়ের ভাঁজেই নতুন করে ঘর নির্মাণ করেছেন। সেদিনের দুর্বিষহ ঘটনার কথা মনে হলে এখনও গা শিউরে ওঠে তার। কিন্তু ভালো কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় পাহাড় ছাড়তে পারেননি।

রাঙামাটির কাউখালীতে পাহাড় ধসে স্ত্রী আর ছেলেকে একদিনেই হারিয়ে ছিলেন ঘাগড়া বাকছড়ি এলাকার ফুলমোহন চাকমা। কিন্তু আবার সেই পাহাড়েই নতুন ঠিকানা গড়েছেন তিনি। একইভাবে পাহাড়ের মৃত্যুকূপে নতুন

করে ঘর বেঁধেছেন

চিত্রলেখা চাকমা, গৈরিকা চাকমা, কালোময় চাকমা ও ফুলবি চাকমারা। বান্দরবানের লেমুঝিরি আগাপাড়ায় পাহাড় ধসে সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন সুমি ও স্বপন দম্পতির তিন সন্তান শুভ, সেতু ও লতা। এ ঘটনার পর সরকার থেকে ৬০ হাজার টাকা অর্থ সাহায্য পেয়েছিলেন তারা। আর এনজিও সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন তাদের দুই বান টিন ও নগদ আট হাজার টাকা দিয়েছিল। সে টিন দিয়ে আবার পাহাড়েই নতুন ঠিকানা গড়েছেন তারা। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়ও পাহাড় ধসে দুই সন্তান হারিয়েছিলেন জসিম উদ্দিন। সরকারিভাবে তিনিও পেয়েছিলেন ঢেউটিন। সে টিন দিয়ে তারাও নতুন করে ঘর বানিয়েছেন পাহাড়ের মৃত্যুকূপে।