'হ্যালো, আমি সুব্রত বাইন বলছি, আমাকে চিনতে পারছেন? দেশে আমার কিছু পোলাপান আছে। ওদের টাকা লাগবে। টাকাটা রেডি করেন, আমি পরে ফোন দেব।' ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর মিরপুরের একজন বাসিন্দার মোবাইল ফোনে এভাবেই চাঁদা দাবি করা হয়। বিদেশি নম্বরের ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ওই বাসিন্দার সন্তান ক'জন, কোথায় পড়ালেখা করে এবং বাসার নম্বরও বলা হয়। টাকা না দিলে পরিণতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় তাকে। ওই ঘটনায় তিনি মিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

রামপুরার আরেকজন বাসিন্দাকে ফোন দেওয়া হয় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের নামে। তার কাছ থেকেও চাঁদা দাবি করে বলা হয়, 'ভাই-ব্রাদাররা যাবে, এক লাখ টাকা দিবি।' ওই বাসিন্দা তখন বলেন, 'আমি ছোট চাকরি করি, এত টাকা দেব কোত্থেকে?' এরপর ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয়-'তাহলে যা পারবি দিয়ে দিবি। পুলিশকে বললে মৃত্যুর জন্যও প্রস্তুত থাকবি।' আতঙ্কে ওই বাসিন্দা আর থানাতে অভিযোগ করেননি।

শুধু এই দুইজনই নন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম করে ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক ও সাধারণ মানুষের কাছে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। কেউ কেউ প্রাণ ভয়ে ঝামেলা এড়াতে চাঁদা দিচ্ছেন। কেউ নিজের ফোন নম্বর পর্যন্ত বদলে ফেলছেন। চাঁদা দাবি করে ফোন পাওয়া বেশিরভাগ মানুষই আতঙ্কে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পর্যন্ত অবগত করেন না। নিজেদের মোবাইল ফোনে অপরিচিত নম্বর ভেসে উঠলেই আতঙ্কে থাকেন হুমকি পাওয়া ব্যবসায়ীরা।

নাম প্রকাশ না করে রামপুরার ওই বাসিন্দা সমকালকে বলছিলেন, তার মোবাইল ফোনে অপরিচিত কেউ ফোন দিলেই আঁতকে ওঠেন তিনি। এখন আর অপরিচিত নম্বরের ফোন ধরেন না। এতে তার অনেক পরিচিতজন নতুন কোনো নম্বরে ফোন দিলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না।

কাফরুল এলাকায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলছিলেন, তার কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের নাম করে ফোনে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। বিষয়টি তার কাছে বিশ্বাস হয়নি। কারণ, তার সবকিছু বিক্রি করলেও এত টাকা হবে না। এটা তিনি বলেও দিয়েছেন। এরপর তাকে আর ফোন না দিলেও সব সময়েই তিনি আতঙ্কের মধ্যে থাকেন।

ফোনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর) উপ-কমিশনার মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, ঈদসহ নানা উৎসবে প্রতারকরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা বিভিন্ন সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করে চাঁদা দাবি করে। শুরুতে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হলেও দরকষাকষিতে তা কমে আসে।

তারপরও পুলিশ বিষয়টি ছোট করে দেখে না। বিভিন্ন সময়েই চাঁদাবাজ প্রতারকদের গ্রেফতার করা হয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই তা নিকটস্থ থানায় জানানোরও পরামর্শ দেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

এ ধরনের প্রতারকদের হাতে ব্যবসায়ী বা ব্যক্তির বিস্তারিত তথ্য যায় কীভাবে জানতে চাইলে ডিবির এ কর্মকর্তা বলেন, তারা বিভিন্ন সময়ে চক্রগুলোর অনেক সদস্যকে গ্রেফতার করে জানতে পেরেছেন নানা কৌশলে তারা টার্গেট ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করে। গৃহকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফরমে দেওয়া তথ্যও সংগ্রহ করে চক্রের সদস্যরা।

ডিবির অপর এক কর্মকর্তা বলেন, কোন শ্রেণির ব্যক্তিদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে সেটা দেখলেই ঘটনা বোঝা যায়। তবে অনেক বড় ব্যবসায়ী বা নতুন বাড়ি নির্মাণকারী মালিকদের কাছে অনেক সন্ত্রাসীই চাঁদা দাবি করে থাকে। অভিযোগ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।

ডিবি সূত্র জানায়, সাধারণত বিদেশি কোনো মোবাইল ফোন অপারেটরের নম্বর ব্যবহার করে চাঁদার জন্য ফোন দেওয়া হয়। এসব নম্বর যাচাই করে দেখা গেছে, দেশের কোনো এলাকাতে বসেই রোমিং করা নম্বরে কথা বলা হয়। কিন্তু রোমিং নম্বর হওয়ায় তা সব সময়ে শনাক্ত করাও সম্ভব হয় না। এ ছাড়া নানা সফটওয়্যার ব্যবহার করেও ফোনে হুমকি দেওয়ায় নম্বর পর্যন্তও মোবাইল ফোনে ভেসে ওঠে না।

শাহিন শিকদার আতঙ্কে কাফরুলের বাসিন্দারা :গত বছরের অক্টোবরে কাফরুল এলাকায় রুবেল ও মিজানুর রহমান নামে দুই ব্যক্তি খুন হন। হত্যার আগে তাদের কাছ থেকে শাহিন শিকদারের নামে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দেওয়াতেই তার খুন হন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই সময় অভিযোগ করা হয়। ওই দুটি ঘটনায় বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হলেও পুলিশ সেই শাহিন শিকদারের সন্ধান পায়নি। তবে ফোনে ওই সন্ত্রাসী ও তার সহযোগীর নামে এখনও চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কাফরুলের কচুক্ষেত এলাকার দুই ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, শাহিন শিকদারের নাম করে তাদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। চাঁদা না দিলে রুবেল ও মিজানুরের পরিণতি হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। আতঙ্কে তারা পুলিশকেও কিছু বলছেন না।

ওই দুই ব্যবসায়ীর একজন বলেছেন, পুলিশকে জানালে হয়তো পুলিশ দোকানে নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু তাদের বাসা, স্ত্রী-সন্তান তো অনিরাপদ থেকে যায়। নিজের চলাচলও সংকুচিত হয়ে যায়। অবশ্য এর আগে চাঁদা দাবির হুমকি পেয়ে একজন ব্যবসায়ী থানায় জিডির পর পুলিশ তার দোকানে নিরাপত্তা পাহারা বসিয়েছিল। এতে আতঙ্কে ক্রেতারা আর ওই দোকানে যেতে চায় না।

কথিত সন্ত্রাসী শাহিন শিকদারের বিষয়ে জানতে চাইলে কাফরুল থানার ওসি মোহাম্মদ সেলিম সমকালকে বলেন, ওই নামে একজন সন্ত্রাসীর নাম শোনা যায়। তার নামে কিছু অপকর্মের অভিযোগ থাকলেও তাকে কেউ দেখেনি। ওই সন্ত্রাসী বিদেশে থাকে বলে তথ্য রয়েছে। তবে যেখানেই থাকুক, অপরাধ করে কোনো সন্ত্রাসী রক্ষা পাবে না।





মন্তব্য করুন