কেনাকাটার অর্থনীতি চাঙ্গা

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০১৯      

শেখ আবদুল্লাহ ও মিরাজ শামস

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে কেনাকাটা। সবারই চাই নতুন জামা-জুতো। গৃহস্থালি নানা পণ্যের কেনাকাটা তো আছেই। ঈদের লেনদেন বলতে শুধু কেনাকাটা বললে কম বলা হবে। শহর থেকে গ্রামে শিকড়ের টানে যাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। এতে চাঙ্গা পরিবহন খাত। শহর থেকে গ্রামে- সব জায়গায় কেনাকাটা ও অন্যান্য ব্যয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এক ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এবার ঈদের কেনাকাটার সঙ্গে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট।

পোশাক পরিচ্ছদের বিক্রেতা, ইলেকট্রনিকস ও আসবাবপত্রের ব্যবসায়ী, পর্যটন ও পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সব খাতেই কেনাকাটা বেড়েছে। পোশাক ব্যবসায়ীরা বলছেন, সারাবছরের বিক্রির অর্ধেকই হয় ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, প্রবাসীরা বেশি বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা বেড়েছে। বেড়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন। নগদ টাকার পাশাপাশি ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটাও বেড়েছে।

ঈদে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আসে। ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বাড়ে ব্যাপক হারে। মানুষের চাহিদা পূরণে বাজারে ৩০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত ১৩৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ঈদ সামনে রেখে প্রতিবছরই প্রবাসীরা অতিরিক্ত অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। এ বছর অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড হবে। এদিকে, প্রতি মাসে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে দেশে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। ঈদ সামনে রেখে এই অঙ্ক পাঁচ থেকে সাত হাজার কোটি টাকা বাড়বে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। যারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বাড়িতে টাকা পাঠান, তারা বেশি পাঠাচ্ছেন। আবার অনেকে কেনাকাটায় ছাড় পাওয়ার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে মূল্য পরিশোধ করছেন। আবার ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনও বেড়েছে।

ঈদের সময়ে টেলিভিশনসহ ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে। এবার বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কারণে টেলিভিশনের চাহিদা আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোহাব্বত উল্লাহ সমকালকে বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার ঈদে টেলিভিশনের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে। এই বাজার বৃদ্ধির পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হবে। বাংলাদেশ দলের জার্সিও বিক্রি হচ্ছে দেদার। অনেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জার্সি কিনে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী আত্মীয়স্বজনের কাছে কুরিয়ারে পাঠাচ্ছেন।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এবার ঈদে বাণিজ্য গড়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে। এ ঈদে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার পোশাকের লেনদেন হবে বলে সমিতির ধারণা। এ ছাড়া পাদুকাসহ চামড়াজাত পণ্য, টেলিভিশন, প্রসাধনী, গহনা, ফার্নিচারসহ বিভিন্ন গৃহসামগ্রীর কেনাকাটা বেশ জমজমাট। সব মিলিয়ে এসব পণ্যের লেনদেন হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার। এই ঈদের আগে রমজান ও পরে আপ্যায়ন মিলিয়ে প্রায় দেড় মাস বাড়তি ভোগ্যপণ্যের চাহিদা তৈরি হয়। এই উৎসব ঘিরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করবেন ভোগপণ্যের ব্যবসায়ীরা। ঈদুল ফিতরে দেশে আনুমানিক কমবেশি ৭০ লাখ কেজি নানা ধরনের সেমাইয়ের চাহিদা থাকে, যার মূল্য প্রায় দেড়শ' কোটি টাকা। ঈদের পর পরই বিয়েসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজনে বাড়তি ব্যয় রয়েছে।

এফবিসিসিআইর সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার ঈদে অনেক বেশি কেনাবেচা হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি হবে। তিনি বলেন, এবার রমজান ও ঈদের পণ্যের দাম স্থিতিশীল ছিল। এ কারণে কেনাবেচাও জমেছে। বিশেষ করে এবার বিদেশি পোশাক বিক্রি হয়েছে। দেশি পোশাকের কদর ভালো ছিল। সব মিলিয়ে এবার ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ ছিল। এ কারণে ভালো

ব্যবসা করেছেন দোকান মালিকরা।

ঈদ উৎসবে গ্রামে যাওয়া-আসার পাশাপাশি ভ্রমণ কিংবা বিনোদনে বড় অঙ্কের ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবহনে বড় ব্যয় করছে। তা ছাড়া দেশে ভ্রমণের পাশাপাশি অনেকেই বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে পরিবহন ও পর্যটন খাতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে ধরা হচ্ছে। ঈদের কেনাকাটা ছাড়াও বড় অঙ্কের লেনদেন হচ্ছে ফিতরা ও জাকাতে। এ খাতে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এবার ঈদে বেচাকেনা, পরিবহন, পর্যটন, জাকাতসহ সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে।

রমজান ও ঈদ উপলক্ষে মানুষের বাড়তি খরচের মনোভাব থাকে। এ সময় চাকরিজীবীদের বোনাসের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ধনী মানুষের দেওয়া জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে দরিদ্রদের হাতেও এ সময় বাড়তি অর্থ যায়। রমজান মাসে দান-খয়রাতও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ফলে সব পর্যায়ের মানুষই অতিরিক্ত খরচ করার সুযোগ পান।

ঈদের সময়ে মানুষের যাতায়াত বেড়ে যায়। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। চাঙ্গা হয় পরিবহন খাত। ঈদ কেন্দ্র করে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যাপক ব্যয় হচ্ছে। এসব ব্যয় নিয়মিত অর্থপ্রবাহের বাইরে অতিরিক্ত হওয়ায় অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য বেড়ে যায়। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) বলছে, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লেনদেন হবে স্বর্ণের।

এক হিসাবে দেখা গেছে, ঈদ উপলক্ষে ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্ভাব্য বোনাস প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। দেশব্যাপী ২৫ লাখ দোকানের প্রায় ৬০ লাখ কর্মচারীর বোনাস চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা। পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অন্যান্য খাতেও বড় অঙ্কের বেতন-বোনাস রয়েছে।