বিশ্ব পরিবেশ দিবস কাল

বছরে ২১০ দিনই বায়ুদূষণের কবলে ঢাকার মানুষ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০১৯      

আলতাব হোসেন

বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২১০ দিনই বিপজ্জনক বায়ুদূষণের কবলে থাকেন ঢাকার মানুষ। শুস্ক মৌসুমে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পুরো সময়টায় দূষণের মাত্রা থাকে বিপজ্জনক অবস্থায়। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত বায়ুর শহর হিসেবে পরিচিত। ঢাকার বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া মাত্রার চেয়ে ১০ গুণ বেশি। বায়ুদূষণের কারণে আলঝেইমারস বা স্মৃতিভ্রম রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে নগরবাসী। বায়ুদূষণকে অদৃশ্য ঘাতক হিসেবে বর্ণনা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের বাতাসের মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে এমন তথ্য মিলেছে। বিশ্নেষণে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ১৬৫ দিন রাজধানীর বায়ু বিপজ্জনক পর্যায়ে ছিল। পর্যায়ক্রমে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। ২০১৫ সালে দূষণের মাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৮ দিন। এর পর ২০১৬ সালে দূষণ ছিল ১৮২ দিন। আর ২০১৭ সালে ১৯৮ দিন পর্যন্ত দূষণের কবলে ছিল ঢাকার মানুষ। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২১০ দিনই ছিল ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা চরম বিপজ্জনক। বছরের অন্য দিনগুলো মূলত বর্ষাকাল হওয়ায় দূষণের মাত্রা কম থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জার্মানির ম্যাক্সপ্লানক ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, শুধু বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর অন্তত ২৫ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ। শ্বাস নিতে গিয়ে একজন মানুষ প্রতিদিন ফুসফুসের মাধ্যমে দুই হাজার লিটারের বেশি বাতাস গ্রহণ করে থাকে। এই শ্বাস গ্রহণের সময়ই ফুসফুসে ঢুকছে অস্বাস্থ্যকর বস্তুকণা। দূষিত বায়ুর এই বস্তুকণা মানুষের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণ রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় গত ১৩ মার্চ হাইকোর্ট হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এর আগে হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানাতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সচিবদের তলব করেন হাইকোর্ট।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণায় ঢাকার বাতাসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সালফার ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ঢাকার বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম ধূলিকণা ভেসে বেড়ায়। সহনীয় মাত্রার চেয়ে এই পরিমাণ পাঁচগুণ বেশি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন জানান, রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ে সর্বশেষ জরিপে উঠে এসেছে ২৪ দশমিক পাঁচ শতাংশ শিক্ষার্থীর ফুসফুসের সক্ষমতা দ্রুত কমছে। দিনের পর দিন বায়ুদূষণ বাড়ছে। ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে যে ক্ষুদ্রকণা মানুষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে টেনে নেয়, তা হৃদরোগ এবং নানা ধরনের শ্বাসরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকরা বলছেন, দূষিত বাতাসের কারণে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বায়ুদূষণ মানুষের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনলে বছরে চিকিৎসা ব্যয় ৫০ কোটি ডলার সাশ্রয় সম্ভব হবে। বিশ্বজুড়ে মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে চতুর্থ প্রধান কারণ এখন বায়ুদূষণ।

জাতিসংঘের তথ্য মতে, বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অকালে মারা যাচ্ছেন। এশিয়া-প্রশান্ত

মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। 'বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়। আর বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম।

এ রকম পরিস্থিতিতে আগামীকাল বুধবার (৫ জুন) বিশ্বব্যাপী পালিত হবে পরিবেশ দিবস। ঈদুল ফিতরের কারণে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হবে আগামী ২০ জুন। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে- 'বায়ুদূষণ'। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে- 'আসুন বায়ুদূষণ রোধ করি।' দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ পদক ও পরিবেশ মেলার উদ্বোধন করবেন। দেশব্যাপী র‌্যালি, আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ ও সারাদেশে গাছের চারা বিতরণ করা হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল্লাহ আল মহসীন চৌধুরী বলেন, দূষণ বন্ধে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন ২০১৯ জারি করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবেশগত মান উন্নয়ন ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে এসডিজি অর্জন করা সম্ভব হবে না।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার বলেন, বায়ুদূষণের ফলে বিশেষ করে রান্না এবং জ্বালানির ধোঁয়া থেকে প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ মারা যায়। দেশে ইটভাটার ধোঁয়া, উন্মুক্ত ট্রাকে নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন এবং উন্মুক্ত নির্মাণ কার্যক্রম, ভাঙা রাস্তাঘাট, কলকারখানার কালো ধোঁয়া, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ইত্যাদিকে বায়ুদূষণের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর যানবাহনের কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, বায়ুদূষণের মাত্রা সার্বক্ষণিক পরিবীক্ষণের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর শহরে মোট ১১টি সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। দেশের বড় শহরগুলোতে আরও ১৫টি বায়ুমান পরিবীক্ষণ যন্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্লিন এয়ার অ্যাক্টের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।