দুই শিক্ষার্থী মৃত্যুর দুই বছর

এখনও অনিরাপদ জাবিসংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৯      

আরিফুল নেহাল, জাবি

দুই বছর আগে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) দুই ছাত্রের মৃত্যু হয়। সে সময় নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবি পূরণের আশ্বাস দেয়। তবে সেই আশ্বাস এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি। অনিরাপদই রয়ে গেছে জাবিসংলগ্ন সড়কটি।

২০১৭ সালের ২৬ মে দুর্ঘটনায় জাবির মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান নিহত হন। পরদিন ২৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা জয় বাংলা ফটকে পদচারী সেতু নির্মাণ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বক্স বসানো, ফটকগুলোর সামনে গতিরোধক বসানোসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। সে সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ। এতে অন্তত ১০ শিক্ষার্থী আহত হন। হামলার কারণ জানতে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনে গেলে উপাচার্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা না বলেই তার বাসভবন ভাংচুর ও শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগ এনে ৫৪ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় ৪২ শিক্ষার্থীকে কারাগারেও পাঠানো হয়। শিক্ষার্থীরা বলেন, লাগাতার আন্দোলন ও নানা সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা প্রত্যাহার করে নিলেও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অনিরাপদই থেকে গেছে।

সর্বশেষ গত ১৯ মে রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে বাসচাপায় এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। তার পরও টনক নড়েনি প্রশাসনের। মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও জোরদার হবে বলে মনে করেন ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'বারবার আশ্বাস দেওয়ার পরও দাবি পূরণ করা হচ্ছে না। এরপর এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামানো যাবে না।'

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) নুরুল আলম বলেন, ছাত্রছাত্রীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পদচারী সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। আর যেটুকু অপূর্ণ আছে, সেগুলোও দ্রুত পূরণ করা হবে।

অর্ধনির্মিত পদচারী সেতু :শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় বাংলা ফটকে একটি পদচারী সেতু নির্মাণের কাজ গত বছরের অক্টোবরে শুরু হয়। কিন্তু আট মাসেও কাজ শেষ হয়নি। পদচারী সেতু নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কংক্রিট অ্যান্ড স্টিল টেকনোলজিস লিমিটেডের সাইট ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম বলেন, 'একটা পদচারী সেতু নির্মাণে দুই থেকে তিন মাসের বেশি সময় লাগে না। কিন্তু বিদ্যুতের খুঁটি না সরানোয় কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।'

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী ইকবাল বলেন, 'বিদ্যুতের খুঁটি সরানোর জন্য আমরা বিদ্যুৎ বিভাগকে প্রয়োজনীয় টাকা দিয়েছি। কিন্তু তারা খুঁটি সরাতে দেরি করেছে।' তবে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর এজিএম (ইঞ্জিনিয়ারিং) নিত্যানন্দ কুণ্ডু বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি সরানোর জন্য অর্থ দিতে দেরি করায় সরানো সম্ভব হচ্ছে না। ঈদের আগে খুঁটি সরানো সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

জ্বলছে না সড়কবাতি, বেড়েছে ছিনতাই :আলোকস্বল্পতা ও প্রয়োজনীয় নজরদারির অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে সিঅ্যান্ডবি পর্যন্ত আধাকিলোমিটার এলাকায় প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত ২৩ মে সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন ছিনতাইয়ের শিকার হন। সন্ধ্যার পর বাইসাইকেলে করে টিউশনিতে যাওয়ার সময় প্রধান ফটক ও মীর মশাররফ হোসেন হলসংলগ্ন ফটকের মাঝামাঝিতে ছিনতাইয়ের শিকার হন তিনি। এ সময় চাপাতি হাতে তিনজন মুখোশধারী ব্যক্তি ছিল।

শিক্ষার্থীরা বলেন, ওই স্থানে একই কায়দায় প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর একই জায়গায় ছিনতাইয়ের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা রংপুরের আশিক, ৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাফিজ, ২৪ অক্টোবর একই ব্যাচের প্রিয়াঙ্কা প্রিয়া, ১২ ডিসেম্বর ৩ জন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, ১৪ ডিসেম্বর ৩৬তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী নাজিম উদ্দিন ও ১৬ অক্টোবর ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহিম। এ ছাড়া চলতি বছরে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছরের মার্চে স্বাধীনতা দিবসে মহাসড়কে আলো নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জরুরিভিত্তিতে সড়কবাতি স্থাপন করা হয়। এর পর বেশ কিছুদিন বাতি সচল থাকলেও এপ্রিলের শুরু থেকে আবার বন্ধ হয়ে আছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মনসুরুল আজিজ বলেন, কাজ চলছে। কাজ শেষ হতে জুন পর্যন্ত সময় লাগবে।

মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণসহ ছিনতাই রোধে সিঅ্যান্ডবি এলাকায় পুলিশ বক্স বসানোর আশ্বাস দিয়েছিল প্রশাসন। এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) তাহমিদুল ইসলাম বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে পুলিশ বক্স বসানোর ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। তবে পুলিশি টইল হয় নিয়মিত। ছিনতাইয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকগুলোকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যামেরা স্থাপন করেই দায়সারা হয়েছে। ক্যামেরা তদারকির যথাযথ কর্তৃপক্ষ নেই। ক্যামেরা স্থাপনের দায়িত্বে ছিলেন গাণিতিক ও পদার্থবিষয়ক অনুষদের ডিন অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার। তিনি বলেন, আমার দায়িত্ব ছিল সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের। সেগুলো তদারকির জন্য পর্যবেক্ষণ কক্ষ নির্মাণ করতে হয়। প্রশাসন এখনও তা করেনি। আশা করি শিগগিরই করবে।