চট্টগ্রামে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় রোগীর মৃত্যু

অধরাই থাকছে অভিযুক্তরা

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৯      

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম নগরের জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতালে চার বছর আগে সিজারিয়ান অপারেশন করতে গিয়ে নবজাতকের ডান পা ভেঙে ফেলেন এক গাইনি চিকিৎসক। চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় এ নির্মম ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন শিশুর বাবা ইকবাল ও মা জান্নাতুল নেছা। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

নানা চাপের মুখে গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনার সত্যতা পেলেও অভিযুক্ত চিকিৎসক কিংবা হাসপাতালের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি কোনো আইনি ব্যবস্থা। একইভাবে গত তিন বছরে এ হাসপাতালে আরও দু'জনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।

জেমিসনের মতোই চট্টগ্রামে বেশকিছু হাসপাতালে বারবার ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় রোগীর মৃত্যু ঘটলেও অধরাই থেকে যাচ্ছে অভিযুক্তরা। প্রতিটি ঘটনার পর চাপের মুখে তদন্ত কমিটি হলেও তাদের রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। তদন্তে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও নেওয়া হয় না কোনো ব্যবস্থা।

এ কারণে এসব হাসপাতাল-ক্লিনিকে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও রোগীর প্রতি অবহেলা বেড়েই চলেছে। অপরাধ করে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পার পেয়ে যাওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে দিন কাটায়।

অভিযোগ আছে, চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রাম শাখা যাচাই-বাছাই ছাড়াই অভিযুক্ত চিকিৎসক বা হাসপাতালের পক্ষ নেয়। অভিযুক্ত চিকিৎসককে বাঁচাতে তারা হাসপাতাল বন্ধ রাখার মতো দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কর্মসূচি ঘোষণা করতেও পিছপা হয় না। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্তরা সুবিচার থেকে বঞ্চিত হয়। সংশ্নিষ্টদের মতে, অপরাধ করে অভিযুক্তরা পার পেয়ে গেলে এ ধরনের সমস্যা বাড়তেই থাকবে।

২০১২ সালের মে মাসে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমিনুল ইসলামের মলদ্বারে অস্ত্রোপচার করেছিলেন ডা. সুরমান আলী ও জাকির হোসেন। এরপর আমিনুল মলদ্বারে ব্যথা অনুভব করলে তারা দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করেন। অবস্থার অবনতি হলে কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালের চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করে মলদ্বার থেকে আস্ত সুঁই বের করেন। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন আমিনুলের মা দেলোয়ারা বেগম। চিকিৎসকদের গ্রেফতার করা হলে বিএমএ নেতাদের আন্দোলনে তারা জামিনে বেরিয়ে আসেন।

গত বছরের ৩০ এপ্রিল জ্বর, পায়খানা ও বমি নিয়ে চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হয় অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নবনী সরকার মৌনতা। ভর্তির এক সপ্তাহ পর মৃত্যু হয় তার। নবনির বাবা প্রদীপ সরকার অভিযোগ করেন, মেয়ের ডেঙ্গু হলেও ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসা দেয় ম্যালেরিয়ার। এ কারণে তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। সঠিক সময়ে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা না পাওয়ায় তার মেয়ের মৃত্যু হয়। ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে মেয়ে হারানোর বিষয়টি চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে জানান প্রদীপ সরকার। তবে অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এখনও ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে এখনও শোকে পাথর নবনীর মা-বাবা।

একই হাসপাতালে ভুল চিকিৎসার শিকার হন নগর পুলিশের স্পেশাল রাইট ফোর্সে কর্মরত (এসআরএফ) নায়েক জাহাঙ্গীর। তিনি গত বছরের ১৩ এপ্রিল ম্যাক্সে ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসা নিতে এসে ভুল অপারেশনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন জাহাঙ্গীর। একই বছরের ১৪ জুন আলিফ হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় এক নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। নবজাতকের বাবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজের সহকারী অধ্যাপক শহিদুল আলম শাহীন এ অভিযোগ করেন। গত বছরের ২৮ জুন সামান্য জ্বর ও গলা ব্যথা নিয়ে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় সাংবাদিক কন্যা রাইফাকে। পরের দিন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর খিঁচুনি বেড়ে দাঁত ভেঙে মুখ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে রাইফার। বিষয়টি হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক দেবাশীষকে জানালে তিনি শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরীকে টেলিফোন করেন। টেলিফোনে ডা. বিধান ওই শিশুকে সেডিল সাপোজিটর প্রয়োগের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনা পেয়ে ডা. দেবাশীষ মাত্রা না দেখেই নার্সকে সেডিল সাপোজিটর প্রয়োগের নির্দেশ দেন। এটি দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে রাইফা। এ ঘটনার পর সাংবাদিকরা ডা. দেবাশীষকে থানায় সোপর্দ করেন। কিন্তু তাকে আটকের পর চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ নেতারা নগরের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এ ঘটনার পর চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএমএর ভূমিকার চরম সমালোচনা করেন মানুষ।

এ অবস্থায় ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসায় অবহেলায় শিশু রাইফার মৃত্যুর ঘটনাটি তদন্তে মাঠে নামে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে গঠিত দুটি তদন্ত দল। এই দুটি তদন্ত দলের রিপোর্টে তিন চিকিৎসক ডা. বিধান রায় চৌধুরী, ডা. দেবাশীষ সেনগুপ্ত ও ডা. শুভ্র দেবের অবহেলার প্রমাণ পান। ১৮ জুলাই অভিযুক্ত ওই তিন চিকিৎসকসহ ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলীকে আসামি করে চকবাজার থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন রাইফার বাবা সাংবাদিক রুবেল খান। দু'দিন পর এজাহারটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করে চকবাজার থানা পুলিশ। ৩০ জুলাই ওই চার চিকিৎসক হাইকোর্ট থেকে চার সপ্তাহের জামিন নেন। ২৭ আগস্ট তারা চট্টগ্রাম সিএমএম কোর্টে হাজির হলে তাদের প্রত্যেককে মামলার চার্জশিট হওয়া পর্যন্ত জামিন দেওয়া হয়।

গত বছরের ৩ জুলাই লোকমান চৌধুরী নামে এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে ফর্টিস হাসপাতালের বিরুদ্ধে। একই দিন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে লাভলী আক্তার নামে তিন সন্তানের এক জননীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে।

গত ১২ সেপ্টেম্বর নগরের পার্কভিউ হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসায় মো. সাকের নামে একজনের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। তিনি মাথাব্যথার চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। সর্বশেষ গত ৯ এপ্রিল ভুল চিকিৎসায় বোয়ালখালীর সারোয়াতলী খিতাপচর গ্রামের খগেন্দ্র লাল দাশের ছেলে সমীর দাশের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে।

গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল সার্জিস্কোপ, আলিফ, পেশেন্ট কেয়ার, ন্যাশনাল, শেভরন, ট্রিটমেন্ট, প্লাজমা, ফর্টিস, মেমন মাতৃসদন, চমেক হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকের অবহেলায় প্রায়ই রোগী মৃত্যুর অভিযোগ উঠছে। তদন্ত কমিটি চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে ঘটনার সত্যতা পেলেও কারও বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা। এ কারণে চট্টগ্রামে ক্রমেই বাড়ছে চিকিৎসা নিতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী সমকালকে বলেন, 'চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রাণ হারানো, ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার শিকার হওয়ার মতো বেশ কিছু অভিযোগ বর্তমানে বেশি পাচ্ছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অবহেলা ও গাফিলতির প্রমাণও পাচ্ছি। নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে চিকিৎসকদের আরও বেশি সচেতন হওয়া উচিত।'

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, 'চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিএমডিসি কিংবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ম-কানুন মানা হচ্ছে না। বিএমএসহ চিকিৎসকদের যেসব সংগঠন আছে তাদের উচিত অভিযুক্ত চিকিৎসকদের মদত না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।' বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের (বামাক) বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ডেপুটি গভর্নর আমিনুল হক বাবু বলেন, 'একের পর এক ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে চট্টগ্রামের চিকিৎসার মান প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযুক্ত চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় বারবার এমন ঘটনা ঘটছে।' ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, 'চট্টগ্রামে বরাবরই অধরা থেকে যাচ্ছে দোষী চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ সমস্যার সমাধানে অভিযুক্তদের শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি কঠোর নজরদারির বিকল্প নেই।'