ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে চাপে বিএনপি নেতারা

নতুন কমিটির দাবিতে কাল থেকে গণঅনশন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৯      

কামরুল হাসান

ঈদুল ফিতরের একদিন আগে ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করায় ক্ষোভের মুখে পড়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। নেতৃত্ব নির্বাচনে নতুন কমিটি গঠন ছাড়াই পুরো ছাত্রদলকে 'অস্তিত্বহীন' করায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মানতে পারছেন না তারা। এর প্রতিবাদ ও কমিটি গঠনের দাবিতে আগামীকাল সোমবার থেকে গণঅনশনসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন নেতারা।

ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতা বলছেন, কমিটি গঠন নিয়ে তাদের মতামত পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এতে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য দায়ী ছাত্রদলের কমিটি গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ১০ সদস্যের সার্চ কমিটি। এর বাইরে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভুল বুঝিয়ে এ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছেন। তাই ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের প্রতিও বিক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে এর জন্য তারাই দায়ী থাকবেন।

তাদের অভিযোগ, ছাত্রদল দলের সহযোগী সংগঠন হিসেবে কাগজে-কলমে থাকলেও এর সাংগঠনিক পুরো প্রক্রিয়ায় বিএনপির খবরদারি চলছে। বিগত আন্দোলনে এই সংগঠনের নেতাকর্মীরাই বেশি নির্যাতনের শিকার  হয়েছেন। প্রায় প্রত্যেক নেতাকর্মীর নামে একাধিক মামলা রয়েছে। দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে নিজেদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত  করার পর এখন তাদের ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

গত ৩ জুন রাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল করা হয়। আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতে সংগঠনের নতুন কেন্দ্রীয় সংসদ গঠন করা হবে। সংগঠনের পরবর্তী কাউন্সিলে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা বিষয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের ছাত্রদলের প্রাথমিক সদস্য ও দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র হতে হবে। কেবল ২০০০ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে যে কোনো বছরের এসএসসি অথবা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

এ প্রসঙ্গে কয়েকজন নেতার দাবি, ছাত্রদলের জন্য এখন হঠাৎ করে নির্দিষ্ট বয়সের বাধ্যবাধকতা করা হলেও যুবদল কিংবা স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না। তা ছাড়া ছাত্রদলকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আনার পরিকল্পনাই যদি থাকবে, তাহলে বিগত দিনে সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে কেন প্রায় তিন বছর পার করে দেওয়া হলো।

এর আগে সহযোগী এই সংগঠনের নতুন কমিটি গঠনের জন্য গত ৩১ মে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে ছাত্রদল নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বল্পমেয়াদি কমিটি গঠনের বিষয়ে মতামত দেন। এ সময় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা কমিটি গঠনে তাদের লিখিত দাবিগুলো উপস্থাপন করেন। এতে কমিটি গঠনে বয়সের কোনো বাধ্যবাধকতা না করে স্বল্প মেয়াদে আগামী ১ জানুয়ারি পর্যন্ত একটি কমিটি গঠন এবং পরের কমিটিও এক বছরের স্বল্প মেয়াদে গঠন করে ছাত্রদলের নেতৃত্বের জট কমানোর দাবি করা হয়। এই বৈঠককালে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে স্কাইপে সংযুক্ত ছিলেন।

নেতারা বলছেন, কোনো আহ্বায়ক কমিটি গঠন ছাড়াই আগের কমিটি বাতিল করায় পরবর্তী দেড় মাস ছাত্রদল পুরো 'অস্তিত্ববিহীন' অবস্থায় থাকবে। আবার পরবর্তী কাউন্সিলে কাউন্সিলর কারা হবেন, পদপ্রত্যাশী প্রার্থীরা কোন প্রক্রিয়ায় কার সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে মনোনয়ন জমা দেবেন এবং সংগঠনের দাপ্তরিক কাজ কীভাবে সম্পন্ন করা হবে- এসব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা কৌশল নির্ধারণ না করেই পুরো কমিটিকে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। এতেও নানামুখী প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনের কেন্দ্রীয় একজন নেতা বলেছেন, দল থেকে দেড় মাসের মধ্যে কাউন্সিল করে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এখনও এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কার কাছ থেকে নির্দেশনা পাওয়া যাবে, সেটাও জানানো হচ্ছে না। আবার

সাধারণত কাউন্সিল করার আগে প্রস্তুতি কমিটি কিংবা এ ধরনের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কাউন্সিলর কারা হবেন, সেটাও আগেই জানিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু যেখানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিই নেই, তাই কাদের দিয়ে কাউন্সিলের আয়োজন করা হচ্ছে কিংবা কীভাবে কাউন্সিল করা হবে, তা নিয়ে এখনও অন্ধকারে সবাই।

আরেকজন নেতা বলেছেন, এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন এবং ভোটের মাধ্যমে সংগঠনের পরবর্তী সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন আগের সিদ্ধান্ত বদলে হঠাৎ করেই কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল করে দিয়ে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে ৩৪-৩৫ বছর বয়সের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ওই বয়স নির্ধারণ করায় আগে থেকে সক্রিয় বেশির ভাগ ছাত্রনেতার রাজনীতিই শেষ হয়ে যাবে। তৃণমূলে ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কর্মী তৈরি হয়নি বলে নতুন কমিটিতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। এসব আশঙ্কার কথা দলের হাইকমান্ডকে জানানো হলেও দলের আন্দোলন-সংগ্রামের ভ্যানগার্ড হিসেবে বিবেচিত ছাত্রদলকে দুর্বল করার জন্যই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন এই নেতা।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ইখতিয়ার রহমান কবির সমকালকে বলেছেন, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেওয়ায় কেন্দ্রীয় কমিটির চার শতাধিক নেতাসহ ১১৭টি সাংগঠনিক জেলা শাখার কয়েক হাজার নেতা বাদ পড়ে যাবেন। তাহলে কাদের নিয়ে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন হবে- এটাই তাদের প্রশ্ন। আবার যারা বাদ যাবেন, তাদের পদায়নও করতে হবে। কিন্তু কীভাবে করা হবে, সেটিও বোধগম্য নয়। এ ক্ষেত্রে দলের অন্য সহযোগী সংগঠনগুলোতেও নেতৃত্ব নির্ধারণে একটা নির্দিষ্ট বয়সসীমা বেঁধে বাকিদের বাদ দেওয়া দরকার।

তবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, খুব শিগগির ছাত্রদলের কাউন্সিলের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হবে। জেলা মর্যাদার বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজসহ ছাত্রদলের সব জেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষ দু'জন কাউন্সিলর থাকবেন। তারা ভোট দিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন। আর ছাত্রদল থেকে যারা বাদ পড়বেন, তাদের যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ সহযোগী অন্য সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া হবে।