তরল বর্জ্যে সর্বনাশ সীতাকুণ্ড উপকূলে

ব্যয় কমাতে দূষণ বাড়াচ্ছে ইয়ার্ড মালিকরা

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৯      

আবু সাঈম, চট্টগ্রাম

তরল বর্জ্যে সর্বনাশ সীতাকুণ্ড উপকূলে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নিয়ম না মেনে কাটা হচ্ছে জাহাজ। এতে তরল বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে সমুদ্রে- সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের সমুদ্রের পানিতে নিত্যদিনই ভাসতে দেখা যায় ছোপ ছোপ কালো তেল। আমদানি করা স্ট্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে নির্গত হয় এই দূষিত তেল। নিয়ম না মেনে জাহাজ কাটার ফলে এসব তরল বর্জ্য সমুদ্রের পানিতে মিশে সর্বনাশ করছে উপকূলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের। স্ট্ক্র্যাপ জাহাজের তরল এবং কঠিন বর্জ্য (এসবাসটস) দূষণমুক্ত করতে প্রতিটি ইয়ার্ডে রয়েছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। কিন্তু খরচ বাঁচাতে এসব যন্ত্র ব্যবহার করেন না ইয়ার্ড মালিকরা। শুধু তাই নয়, জাহাজ কাটার সময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দূষণ রোধের অধিকাংশ নিয়মনীতিই মানছেন না তারা। মাঝেমধ্যে জরিমানা করা হলেও বেশিরভাগ সময় এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা নির্বিকার ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অবশ্য পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মোয়াজ্জম হোসেনের দাবি, জাহাজ কাটার ক্ষেত্রে যারা আইন মানছেন না তাদের জরিমানা করা হচ্ছে। সমকালকে তিনি জানান, ইয়ার্ড মালিকদের আইন মেনে জাহাজ কাটার এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এই অঞ্চলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য সংস্থার নজরদারিও বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন  এই কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (কারিগরি) মুক্তাদির হাসান জানান, সম্প্রতি বেশ কয়েকটি শিপইয়ার্ডে অভিযান চালিয়ে তারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো আয়োজনই দেখতে পাননি। বেশিরভাগ ইয়ার্ডের এসবাসটস ও তরল বর্জ্য সমুদ্র এবং আশপাশের খাল ও ছড়ায় ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এ জন্য বিভিন্ন ইয়ার্ডকে শোকজ এবং জরিমানা করা হয়েছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে এইচ এম শিপিংইয়ার্ডকে ৮০ হাজার টাকা, জাহানাবাদ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডকে ৬০ হাজার টাকা, এসএনটি শিপ রিসাইক্লিংকে ৬০ হাজার টাকা, কদমরসুল স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডকে ৫০ হাজার টাকা, খাজা শিপ ব্রেকিংকে পাঁচ লাখ টাকা, এসএল শিপ রিসাইক্লিংকে ৫০ হাজার টাকা এবং সিকো স্টিল ও সাগরিকা বিল্ডার্সকেও জরিমানা করা হয়।

অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ১৩টি শিপ ইয়ার্ডে অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে পিএইচপি এবং প্রাইম ছাড়া বাকি ১১টি শিপইয়ার্ডকে নিয়ম মেনে কাজ করতে দেখা যায়নি। সরেজমিন পরিদর্শনে কর্মকর্তারা দেখতে পান, শিপইয়ার্ডগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে অয়েল ওয়াটার সেপারেশন প্ল্যান্ট, ইনসিনারেটরসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থার জন্য আলাদা আলাদা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার কথা থাকলেও এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না। স্ট্ক্র্যাপ জাহাজের অব্যহূত তেল সরাসরি সমুদ্রে কিংবা সংযোগ খালে ছড়িয়ে দিতে দেখা গেছে অনেক ইয়ার্ডকে।

সূত্র জানায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী চট্টগ্রামে শিপইয়ার্ডের সংখ্যা

৮১টি, যদিও বাস্তবে এ সংখ্যা দেড় শতাধিক। এর মধ্যে অনেক শিপইয়ার্ড পরিবেশ অধিদপ্তরের মেয়াদোত্তীর্ণ ছাড়পত্র নবায়ন না করেই কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। বেশিরভাগ ইয়ার্ডে দূষণ ঠেকানোর যন্ত্রপাতি থাকার পরও তা ব্যবহূত হচ্ছে না। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানার পরও এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। স্রেফ জরিমানা আর শোকজ করেই তারা নিজেদের দায়িত্ব সম্পন্ন করছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিপ ব্রেকিং এনজিও প্ল্যাটফর্ম অব বাংলাদেশ কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, সরকারি সংস্থার পাশাপাশি তারাও ইয়ার্ড মালিকদের নিয়ম মেনে জাহাজ কাটার জন্য বারবার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু ইয়ার্ড মালিকরা এসব অনুরোধে কান দেন না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও জোরদার করতে হবে।

পিএইচপির শিপ গ্রিন ইয়াড ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য জহিরুল ইসলাম রিংকু জানান, দূষণ ঠেকাতে কঠোরভাবে কাজ করছেন তারা। শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বাস্তবায়ন করেছেন। যারা এখনও তা করেনি, সমিতির পক্ষ থেকে তাদের বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।