বাংলামটরে শিশু সাফায়েত 'হত্যা'র ছয় মাস

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে থমকে আছে তদন্ত

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৯      

ইন্দ্রজিৎ সরকার

 ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে থমকে আছে তদন্ত

রাজধানীর বাংলামটরে শিশু সাফায়েতকে হত্যার অভিযোগে তার বাবা নুরুজ্জামান কাজলকে গ্রেফতার করা হয়- ফাইল ছবি

ঘরের ভেতর আড়াই বছরের সন্তানের লাশ নিয়ে দা হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন নুরুজ্জামান কাজল। বন্ধ দরজার বাইরে উৎসুক মানুষের গুঞ্জন- বাবার হাতেই খুন হয়েছে শিশুটি। কেউ ঘরের দিকে এগোলেই তিনি দা নিয়ে তেড়ে আসছেন। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর রাজধানীর বাংলামটরে এমন রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তার অবসান হয়েছিল ছয় ঘণ্টা পর। তবে সেই ঘটনার রহস্যের জট খোলেনি দীর্ঘ ছয় মাসেও। শিশু নূর আহাম্মদ উল্যাহ সাফায়েতের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, সেদিন তার বাবার ভূমিকাই বা কী ছিল- এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া শিশুটির মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। তাই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় কার্যত থেমে আছে তদন্ত।

শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান সমকালকে বলেন, শিশুটিকে হত্যা করা হয়ে থাকলে তদন্তের গতিপথ এক রকম হবে। তখন দেখতে হবে কে বা কারা এতে জড়িত, কেনই-বা এই হত্যাকাণ্ড। আবার অন্য কোনো কারণে তার মৃত্যু হলে দেখতে হবে তাতে কারও দায় ছিল কি-না। ফলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। পাশাপাশি পুলিশ তাদের মতো ঘটনাটি তদন্ত করছে। তবে এখনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

বাংলামটর লিংক রোডের ১৬ নম্বর বাড়ির দোতলায় দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন কাজল। ঘটনার দিন দুপুরে ওই বাড়ি থেকে সাফায়েতের লাশ উদ্ধার এবং কাজলকে আটক করে পুলিশ। এর আগে শিশু হত্যার খবর পেয়ে সকাল থেকেই বাড়িটি ঘিরে রেখেছিলেন পুলিশ-র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। এ ঘটনায় হত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেন শিশুটির মা মালিহা আক্তার প্রিয়া।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, মামলার একমাত্র আসামি কাজলকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তবে সন্তানের মৃত্যুর ব্যাপারে তিনি অসংলগ্ন বক্তব্য দিয়েছেন। কখনও বলেছেন, অসুস্থতাজনিত কারণে তার সন্তানের মৃত্যু হয়। আবার কখনও হত্যার কথাও বলেছেন। তাকে সুস্থ-স্বাভাবিক মনে হয়নি। ময়নাতদন্তে শিশুটির মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পেলেও সে কারণেই তার মৃত্যু হয় কি-না, তা নিশ্চিত হতে পারেননি সংশ্নিষ্টরা।

ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানিয়েছিলেন, শিশুটির গলব্লাডার ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বড়। দিনের পর দিন না খেয়ে থাকলে গলব্লাডার সাধারণত এমন হয়। শিশুটি অপুষ্টিতে ভুগছিল।

পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, মৃত্যুর আগে অসুস্থ ছিল সাফায়েত। বাসায় তার মা ছিলেন না; বাবাও যত্ন নেননি। তাকে ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যাওয়া হয়নি। এর মধ্যে ৪ ডিসেম্বর রাতে খেলছিল সাফায়েত ও তার ভাই। তাদের  হৈচৈ শুনে ক্ষেপে যান কাজল। তিনি সাফায়েতকে মারধর করেন। এ কথা স্বীকার করে তিনি পুলিশকে বলেছেন, 'আগের রাতে বাবুকে মেরেছিলাম। তখন ওর গায়ে খুব জ্বর ছিল। সকালে দেখি, সে নড়াচড়া করছে না।'

এদিকে কাজলের স্ত্রী মালিহা আক্তার প্রিয়ার অভিযোগ, প্রায়ই মাদক সেবন করে বাসায় ফিরে গালাগাল ও মারধর করতেন কাজল। ঘরের দরজা-জানালাও ভাংচুর করতেন। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর পারিবারিক কলহের জের ধরে দা দিয়ে মারতে উদ্যত হলে মালিহা প্রাণভয়ে দুই সন্তানকে রেখে বাবার বাড়ি কামরাঙ্গীরচরে চলে যান। এর পর ৪ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকে কাজলের ভাই উজ্জ্বল ফোন করে মালিহার বাবাকে জানান, সাফায়েত মারা গেছে। পরদিন সকালে খবরটি জানতে পেরে মালিহা দ্রুত বাংলামটরের বাসায় যান। তখন কাজল দা নিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করলে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে শাহবাগ থানায় বিষয়টি জানান। পরে পুলিশ বাসায় ঢুকতে গেলে কাজল তার বড় ছেলে নুর সলিম উল্যাহ সুরায়েতের গলায় দা ধরে জিম্মি করে রাখেন।

অন্যদিকে কাজলের আইনজীবী আবদুস সাত্তারের দাবি, বাংলামটরে কাজলের পৈতৃক বাড়িটি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন মালিহা আক্তার। কাজল রাজি না হওয়ায় তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান।