অনুমোদনের ৫ বছরেও হয়নি রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯

মেরিনা লাভলী, রংপুর

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনুমোদনের পাঁচ বছরেও গঠিত হয়নি 'রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ'। এতে বিভাগীয় জেলা রংপুরে পরিকল্পিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নাগরিকরা। অপরিকল্পিত উন্নয়নও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কৃষি খাতে অভাবনীয় সাফল্যের কারণে এবং অনেক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তি ও বিশিষ্টজনের জন্মস্থান হওয়ায় রংপুর অনেক আগে থেকেই সারাদেশে সুপরিচিত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্বশুরালয় রংপুরে। ২০১১ সালের ৮ জানুয়ারি জিলা স্কুলের সমাবেশে তিনি রংপুরের উন্নয়ন নিজ কাঁধে তুলে নেন। এরই অংশ হিসেবে রংপুর বিভাগ, সিটি করপোরেশন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও চার লেন মহাসড়ক নির্মাণ হয়েছে। পীরগঞ্জে মেরিন একাডেমি, তারাগঞ্জে পল্লী উন্নয়ন একাডেমিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। ২০১২ সালের ২৮ জুন রংপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে নগরীতে বেড়েছে মানুষের সংখ্যা। প্রায় ১০ লাখ নাগরিকের এ নগরীতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, শপিংমল, আবাসিক ভবন। ফলে যানজট, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পানি নিস্কাশনসহ নানা সমস্যা ঘনীভূত হচ্ছে।

দেশের তিনটি বিভাগ রংপুর, সিলেট ও বরিশালে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নেই। তাই ২০১৪ সালের ৮ জুন সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন ভূঁইঞার সভাপতিত্বে প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এগুলোতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ করে স্বশাসিত সংস্থা গঠনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামতের আলোকে টেকনিক্যাল কমিটি যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রস্তাবিত রংপুরসহ তিনটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইনের খসড়া আইন প্রণয়ন করে।

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের জন্য সচিব কমিটিতে উত্থাপিত সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, স্বশাসিত এই তিন সংস্থা গঠন হলে জাতীয় স্বার্থে সিলেট, রংপুর ও বরিশাল এলাকার উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব হবে। তিন বিভাগীয় সদর এলাকায় অপরিকল্পিত উন্নয়ন নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়ন, অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন, হোটেল-মোটেল এবং অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ এ ধরনের সমস্যার মূল কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

তিনটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন সম্পর্কিত আইনের খসড়ার জন্য জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে মতামত নেওয়া হয়েছে বলে সারসংক্ষেপে উল্লেখ রয়েছে।

এতে বলা হয়, এ তিনটি জেলা বিভাগে উন্নীত হওয়ার ফলে অনেক স্থানই আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট করার অনুকূল অবস্থা রয়েছে। এ তিন বিভাগীয় শহরে কর্তৃপক্ষ না থাকায় স্থানীয় পৌরসভায় বেসরকারি পর্যায়ে নির্মিত ভবনের নকশা অনুমোদনসহ অন্যান্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়। যদিও বহুতল ভবন বা নগরীর সৌন্দর্য় রক্ষা করে নগর বিকাশে কোনো ধারণা ও কারিগরি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনবল নেই সিটি করপোরেশনের।

এদিকে মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন ও এর কোনো কার্যক্রমের অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষুব্ধ রংপুর নগরবাসী।

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, রংপুর সিটি করপোরেশন বাংলাদেশের অন্যতম অপরিকল্পিত নগর। এই নগরকে পরিকল্পনার আওতায় আনতে রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করার কথা ছিল। অথচ এটি আজও হয়নি। ফলে রংপুর নগরী যে পথে হাঁটছে, তা পুরান ঢাকার চেয়েও খারাপ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। অনতিবিলম্বে রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরিসহ রংপুরকে ঢেলে সাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সুজন মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, রংপুর বিভাগ, রংপুর সিটি করপোরেশনের দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও পরিকল্পিত নগরী গড়ার কোনো পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। কেন এটাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, এটা ভাবার বিষয়।

রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা সমকালকে বলেন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছর আগে মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদন দিয়েছে। যদিও এখনও এটি বাস্তবায়ন হয়নি। রংপুর উন্নয়ন প্রকল্প এবং নগরীকে ঘিরে কোনো মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সিটি করপোরেশন থেকে ভবনগুলোর নকশা অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না, তা দেখা সম্ভব হচ্ছে না জনবল সংকটের কারণে। রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।