খুলনায় সাংবাদিককে ফাঁসানোর অভিযোগ

মামলায় নানা অসঙ্গতি না দেখেও সাক্ষী

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯

খুলনা ব্যুরো

খুলনায় সাংবাদিক এম এ জলিলের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহারের সঙ্গে মিল নেই ঘটনাস্থলের। তাকে গ্রেফতারের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন পরিদর্শক সাংবাদিকদের যেসব তথ্য দিয়েছিলেন, এজাহারের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যাচ্ছে না। একজন সাক্ষী বলেছেন, তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। সাংবাদিক জলিলের খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ওই এলাকার মানুষ।

গতকাল সোমবার নগরীর মুসলমানপাড়া এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জলিলের মুক্তির দাবিতে গতকাল খুলনায় মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।

রোববার সকালে নিজ বাড়ি থেকে সাংবাদিক জলিলকে আটক করা হয়। পরে বাড়ির পাশের ড্রেন থেকে ১০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার দেখিয়ে তাকে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জলিল খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক খুলনাঞ্চল পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক এবং খুলনা প্রেস ক্লাবের সহকারী সম্পাদক। নগরীর মুসলমানপাড়া এলাকার হাক্কানী জামে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদকও তিনি। গতকাল সোমবার খুলনা মহানগর হাকিমের আদালতে তার জামিনের আবেদন করা হলে আদালত জামিন নামঞ্জুর করেন। সাংবাদিক জলিলের পরিবার এবং খুলনায় কর্মরত সাংবাদিকদের অভিযোগ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক সোর্সের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় তাকে মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। প্রতিবেশীরা জানান, তারা জলিলকে কখনও কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখেননি। এমনকি তার বাড়িতে কখনও অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষকে যাতায়াত করতে দেখেননি। হাক্কানী জামে মসজিদের মুসল্লিরা জানান, সদালাপী ও ধর্মপরায়ণ হিসেবে এলাকায় পরিচিত জলিল।

রোববার জলিলকে আটকের পর নিয়ে যাওয়া হয় খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে। সেখানে সংস্থার  পরিদর্শক পারভীন আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘরের জানালা দিয়ে ফেনসিডিলগুলো ছুড়ে বাইরে ফেলছিলেন জলিল। এ সময় ছাদে থাকা অধিদপ্তরের লোকেরা সেটা দেখতে পায়। যেহেতু ওই বাড়িতে জলিল ও তার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ থাকেন না, এ কারণে ধরে নেওয়া হচ্ছে জলিলই ওই কাজ করেছেন। কতটা দূরত্বে ওই ফেনসিডিলগুলো পাওয়া গিয়েছিল- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ছুড়ে ফেলার সময় পাঁচিলের বাইরেও পড়েছে, ভেতরেও পড়েছে।'

গতকাল রোববার সরেজমিনে দেখা গেছে, জানালা থেকে পাশের দেয়ালের দূরত্ব এক হাতেরও কম। দেয়ালের অন্য পাশে মহিলা মাদ্রাসা। দেয়াল থাকায় কোনো কিছু ছুড়ে দিলে ওই মাদ্রাসার সীমানার মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। পূর্বপাশের জানালার গ্রিলের ফাঁকা অংশের আয়তন সাড়ে ৩ ইঞ্চির কিছু বেশি। এত ছোট স্থান দিয়ে বাজারের ব্যাগে ১০ বোতল ফেনসিডিল কোনোভাবেই বের করা সম্ভব নয়। জানালার ওপরে সানশেড থাকায় জানালা দিয়ে কিছু বাইরে ফেলা হলেও তা ছাদ থেকে দেখা সম্ভব নয়।

ওই মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে জলিলের পাশের বাড়ির শহিদুল ইসলামসহ দু'জনকে। ঘটনার বর্ণনা জানতে চাইলে শহিদুল ইসলাম বলেন, অভিযান শুরুর বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। তবে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় একজন নারী তাকে ডাকেন। তিনি গিয়ে দেখেন একটি কালো কাপড়ের ব্যাগের মধ্যে কয়েক বোতল ফেনসিডিল রাখা আছে। জলিলসহ অন্যরা চেয়ারে বসেছিলেন। এরপর তার কাছ থেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর ও তার মোবাইল নম্বর নেন তারা।

এসব অসঙ্গতির বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী পারভীন আক্তার বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা করা হয়েছে। কী লেখা হয়েছে, সব মনে নেই। তবে যা লেখা হয়েছে সব ঠিক আছে। সোর্সের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করায় সাংবাদিক জলিলকে ফেনসিডিল দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ সঠিক নয়।

গ্রেফতারের প্রতিবাদে মানববন্ধন :সাংবাদিক জলিলকে সাজানো মাদক মামলায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। গতকাল দুপুরে খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনে বক্তারা অবিলম্বে জলিলের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মাদক নির্মূলে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ভণ্ডুল করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করে যাচ্ছে। তারা সোর্সদের মাধ্যমে মাদক কারবারের পথ পরিস্কার রাখতে সাংবাদিক জলিলকে হয়রানিমূলক মামলায় ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় সাংবাদিক সমাজ আতঙ্কিত।

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন খুলনা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের ব্যুরোপ্রধান কাজী মোতাহার রহমান বাবু। দৈনিক কালের কণ্ঠের খুলনা ব্যুরোর নিজস্ব প্রতিবেদক কৌশিক দে বাপী এবং দৈনিক সমকাল ও দৈনিক পূর্বাঞ্চলের স্টাফ রিপোর্টার হাসান হিমালয় মানববন্ধন সঞ্চালনা করেন। মানববন্ধনে বক্তৃতা করেন খুলনা প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের ব্যুরোপ্রধান রাশিদুল ইসলাম, সাপ্তাহিক আমাদের খুলনার চিফ রিপোর্টার হাসান আহমেদ মোল্লা, মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি আবু হেনা মোস্তফা জামাল পপলু প্রমুখ।