নেত্রকোনায় মাতৃমৃত্যুর বড় কারণ অদক্ষ ধাত্রী

২৮ ইউনিয়নে নেই পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০১৯

সাজিদা ইসলাম পারুল

বয়স ত্রিশের কোটা পেরোনোর আগেই বাড়িতে অদক্ষ ধাত্রীর হাতে তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা সদরের রাবেয়া বেগম। একই কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বারহাট্টা উপজেলার বাউসী গ্রামের সজল মিয়ার স্ত্রী তাসলিমা আক্তার (২২)। ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর মতে, অদক্ষ দাই ছাড়াও অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা এবং অসচেতনতা এখানকার প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ। স্ত্রী হারানো সজল মিয়া জানান, মাইলের পর মাইল কাঁচা রাস্তা হেঁটে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা সদর হাসপাতালে যেতে পারেন না। তাই গ্রামের ধাত্রী বা দাইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। তার স্ত্রী তাসলিমার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন সজল। তিনি বলেন, গর্ভকালীন সময়ে পিএইচডির সহযোগিতায় বাউসী সিজি আয়োজিত মা সমাবেশে অংশগ্রহণসহ রক্তের তিনটি পরীক্ষা, নিয়মিত এএনসি সেবা গ্রহণ করেন তাসলিমা। এমনকি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও সিএইচসিপিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। কিন্তু যাতায়াত সমস্যার কারণে অদক্ষ দাইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। তাই মৃত সন্তান জন্ম দেওয়ার এক ঘণ্টা পর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান তার স্ত্রী।

দেশের অবহেলিত একটি জেলা নেত্রকোনা। উপজেলাগুলোতে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এখনও অনেকটা পিছিয়ে। এখানকার প্রধান সমস্যা মাতৃ ও শিশুমৃত্যু। শূন্য থেকে ২৮ দিনের শিশুমৃত্যুহার এখানে সবচেয়ে বেশি। নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে চিকিৎসকসহ জনবল সংকটে চিকিৎসাসেবা অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া জেলার ৮৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫৮টি ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। আর লোকবল সংকট ও অবকাঠামোর অভাবে ২৮টি ইউনিয়নেই এখনও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

নেত্রকোনা জেলা সিভিল সার্জন তাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, নেত্রকোনায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবটা খুব কম। এখনও আমরা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যেতে পারিনি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা হেলথের সব স্টাফ, বিভাগীয় প্রধানদের নিয়ে আমরা এ অনুষ্ঠান করি। এ ছাড়া বাল্যবিয়ে বেশি হওয়ায় মাতৃমৃত্যু বেশি হয়। অল্প বয়সে অন্তঃসত্ত্বা হলেই মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি।

নেত্রকোনা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২ মাসের শিশুর সংখ্যা ৫ হাজার ৫০৭ জন। শূন্য থেকে এক বৎসর বয়সের শিশুর সংখ্যা ৬৬ হাজার ৮৭ জন, শূন্য থেকে পাঁচ বছরের শিশুর সংখ্যা তিন লাখ ৩০ হাজার ৪৩৫ জন। ১৫ থেকে ৪৯ বছরের নারী রোগীর সংখ্যা ছয় লাখ ৩৫ হাজার ৭৫৯।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩১ লাখ শিশু জন্ম দিতে গিয়ে পাঁচ হাজার ২৭০ জন মায়ের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ ৬০০ শিশু জন্ম দিতে গিয়ে একজন মা মারা যান। মাত্র ৪২ শতাংশ প্রসব প্রশিক্ষিত সেবিকাদের হাতে হয়ে থাকে। বাকি ৫৮ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বার প্রসব অপ্রশিক্ষিত ধাত্রী বা আত্মীয়স্বজনের হাতে হয়ে থাকে। এর মধ্যে আবার ৬৩ শতাংশ নারীর প্রসব বাড়িতে হয়ে থাকে। আর মাত্র ৩৭ শতাংশ নারীর ক্লিনিক বা হাসপাতালে প্রসব হয়। ফলে মা ও শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ বাড়িতে অপ্রশিক্ষিত ধাত্রী বা আত্মীয়স্বজনের দ্বারা প্রসব করানো।

এদিকে, মাতৃমৃত্যু রোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি-৫) অর্জনের পথেই রয়েছে। এখনও অনেক মা সন্তান জন্ম দিতে মারা যাচ্ছেন।

জানা যায়, মাতৃমৃত্যু কমাতে নেত্রকোনায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর তিনটি কাজের ওপর জোর দিয়েছে। কমিউনিটি পর্যায়ে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি করা তাদের প্রধান কাজ। তাই নেত্রকোনার অধিকাংশ এলাকায় আগের তুলনায় কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবাগ্রহীতার হার ও সেবা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেবাবঞ্চিত মায়েদের ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে

সেবার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। প?াঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের অনলাইন রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করার জন্য হেলথ এবং পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠ পর্যায়ের স্টাফদেরও সহযোগিতা করা হচ্ছে। এ ছাড়া কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সেবার মান বৃদ্ধির জন্য 'মা সমাবেশ' নামে একটি ইনটারভেনশন পরিচালিত হচ্ছে। ২২২টি মা সমাবেশের মাধ্যমে ১৯ হাজার ৮৭৫ জন মা সেবা পেয়েছেন।

নেত্রকোনা জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, মাতৃত্বকে নিরাপদ করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার আছে। সবাই মিলে সমন্বিতভাবে কাজ করলেই এ অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, নেত্রকোনায় মাতৃমৃত্যু রোধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্গম পাঁচটি উপজেলা- কলমাকান্দা, মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী ও দুর্গাপুরে কেয়ার বাংলাদেশ ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে সচেতনতামূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের জন্য প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। সেইসঙ্গে মাঠকর্মীদের সহযোগিতায় প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তঃসত্ত্বা মায়ের তালিকা করা হয়। পরে মোবাইল ফোনে তাদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।